বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
নারী

বিমান দু/র্ঘটনায় মাইলস্টোনের নিহত শিক্ষিকা মাসুকা বেগম নিপুর দাফন সম্পন্ন

WhatsApp Image 2025-07-23 at 5.23.08 PM

রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারানোদের মধ্যে ছিলেন এক শিক্ষকাও—বাংলা মিডিয়ামের ইংরেজি শিক্ষিকা মাসুকা বেগম নিপু।

জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি ছিলেন তাঁর কর্মস্থলেই, শিক্ষার্থীদের মাঝখানে। দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় গুরুতর আহত হন তিনি, আর সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। বাঁচার লড়াই শেষ হয় ২১ জুলাই, রাত ১২টা পেরোনোর কিছু পর। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবার, সহকর্মী ও পরিচিতজনরা।

মাসুকা বেগম নিপু ছিলেন তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত এই শিক্ষিকা ছিলেন পরিবারে সবার প্রাণ। তাঁর বোনের মেয়ে ফাহমিদা খানম হৃদি বলেন, “খালামণি আমাদের খুবই আদর করতেন। সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। মাঝে মাঝে শাসনও করতেন, কিন্তু তাতেও ছিল একরকম মমতা। তাঁর মৃত্যু আমাদের বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাত দান করেন।”

নিপুর পিতা সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরী ছিলেন এই ঘটনার পর এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে দু-একটি কথার বেশি বলতেই পারলেন না। তিনি জানান, “আমার কন্যার মৃত্যুতে পরিবারের সবাই ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি শুধু সবার কাছে তাঁর জন্য দোয়া চাই।”

শ্যালিকা নিপুকে স্মরণ করে খলিলুর রহমান বলেন, “তিনি ছিলেন ভদ্র, বিনয়ী, দায়িত্বশীল একজন মানুষ। আকস্মিক এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি এবং একইসঙ্গে সব নিহত শিশুর জন্য দোয়া চাই।”

নিহত মাসুকা বেগম নিপুর মূল বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার চিলোকুট গ্রামে হলেও তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় আশুগঞ্জ উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে—যেখানে বসবাস করেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা ও বড় বোন।

বাদ আসর, সোহাগপুর ঈদগাহ মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা এবং সাধারণ মানুষ। সবার চোখে তখন শুধুই কান্না আর শ্রদ্ধা।

একজন প্রাক্তন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের স্মৃতি তুলে ধরে ভৈরব জিল্লুর রহমান সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আবু হানিফ বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে সে আমার আদরের ছাত্রী ছিল। এত বিনয়ী ও মেধাবী একজন শিক্ষার্থী ছিল সে—আজ তার জানাজা পড়তে হবে, এটা ভাবিনি কখনো।”

মাসুকা নিপু ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে পিছনে রেখে শিক্ষার্থীদের আলোকিত করতে নিয়োজিত ছিলেন। পেশাদারিত্ব, মানবিকতা ও ভালোবাসা—এই তিনটিই ছিল তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি।

আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী শাহজাহান সিরাজ বলেন, “মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় আমরা স্তব্ধ। নিপুর মতো একজন শিক্ষিকার মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তাঁর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং সবার কাছে তাঁর জন্য দোয়া প্রার্থনা করি।”

মাসুকা বেগম নিপু শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না—তিনি ছিলেন শিক্ষার বাতিঘর, একজন আদর্শ, একজন ভালোবাসার আশ্রয়। তাঁর এই অকালপ্রয়াণ গোটা জাতির জন্য একটি ক্ষতি, যা কখনও পূরণ হবার নয়।