বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
নারী

পুরনো কর্মস্থলে নতুন অধ্যায়

WhatsApp Image 2025-07-07 at 7.35.03 PM

এসএসসি পরীক্ষার পরই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার পড়ালেখা আর বাড়ানো সম্ভব নয়। পরিবার থেকে জানানো হয়েছিল, “এতটুকু পড়েছো, এবার কাজের মাধ্যমে নিজের পথ তৈরি করো।” তখন হৃদয়ে একটি বিষাদের ছায়া নেমে এসেছিল। বইয়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া মেয়ে আমি, সেদিন কাঁদতে কাঁদতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পরদিন থেকে শুরু করবো কাজ খোঁজা।

আমি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় জন্মেছি এবং বড় হয়েছি। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় আমি। বাবা ছিলেন ফিশারিজ কনট্রাক্টর, মা গৃহিণী। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা কঠিন, তাই পরিবারের কথা না মেনে চলা ছিল অসম্ভব।

আমার কর্মজীবন শুরু হয় ড্রিম বেঙ্গল গার্মেন্টসে, কো-ওয়ার্কার পদে মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৫৬০০ টাকা। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত কাজ করতাম। কাজের পাশাপাশি নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য কম্পিউটার শেখার চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। কারণ জানতাম, যদি নিজের সক্ষমতা উন্নত না করি, তাহলে এ জীবনই চলতে থাকবে।

মা আমার জন্য একটি কম্পিউটার কোর্সের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা ছিল বিনামূল্যের। প্রথম মাসের বেতন দিয়ে ভর্তি হলাম সুলতান আহমেদ ডিগ্রি কলেজে। কম্পিউটারের বেসিক কোর্স শেষ করে যোগ দিলাম একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। সেখানে কর্মঘণ্টা কমল, বেতন বাড়ল, আর পড়াশোনার সুযোগও বেশি পেলাম।

২০১৩ সালে আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে নতুন একটি গার্মেন্টসে কাটিং লিডার পদে যোগ দিলাম। পড়াশোনা থামাইনি, বরং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম। জীবনে থেমে থাকার কোনও ইচ্ছা ছিল না; আমি চেয়েছি নিজেকে সবসময় নতুন নতুন বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে।

২০১৫ সালে হিরদারামানি বাংলাদেশ গার্মেন্টসে যোগদানের পর আমার জীবনে একটি বড় মোড় আসে। এখানেই আমি পেয়েছিলাম বৃত্তির সুযোগ — এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের তরফ থেকে। এই বৃত্তিতে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা পুরোপুরি বিনামূল্যে, থাকাবাসসহ সব খরচও দেওয়া হতো, এমনকি পাঁচ বছর কাজ না করেও গার্মেন্টস থেকে বেতন পাবার সুযোগ ছিল।

অনেকেই ভীত করেছিল, এসব সুযোগ আসলে ফাঁদ, মেয়েদের নিয়ে খারাপ কাজ হয় ইত্যাদি কথা বলে। এমনকি এক শিক্ষক বলেছিলেন, এত বছর পড়াশোনা করলেই বিয়ের বয়স পার হয়ে যাবে, কেউ বিয়ে করবে না। তবে আমার বাবা ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তিনি বলেছিলেন, “পড়াশোনা শুরু করো, কে জানে ভালো কিছু হতে পারে।”

আমি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছি, এবং গার্মেন্টস থেকে একমাত্র বৃত্তিধারী হয়েছি। ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট অর্থনীতিতে স্নাতক শুরু করলাম। এক বছর পর বাবা প্রয়াত হলে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম, কিন্তু আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মার্কিন ব্যবসায়ী স্যাম গিলানি। তিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডোনার, যিনি আমাকে মানসিক শক্তি দিয়েছেন। ২০২১ সালে নেপালে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়, আর ২০২২ সালে আমার বিয়েতে তিনি অবিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। আমার কাবিনে তাঁর নামই লেখা আছে অভিভাবকের জায়গায়।

আরজু আরা বেগমের জীবনে বাবার মতোই দায়িত্ব পালন করেছেন স্যাম গিলানি

আমার জীবন সঙ্গী হুমায়ূন কবির, যিনি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডও বটে। ২০০৬ সাল থেকে আমরা একসঙ্গে স্কুলে পড়াশোনা করেছি, এখন তিনি মেরিনে কাজ করছেন।

পড়াশোনা শেষে আমি আমার গার্মেন্টসে ফিরে সিনিয়র পদে যোগ দিলাম। ২০২৩ সালে সন্তানসম্ভবা হওয়ার সময় হাসপাতাল থেকে ওষুধ পর্যন্ত সব খরচ গার্মেন্টস বহন করেছিল। ছয়-সাত মাসের ছুটি শেষে আমি কাজে ফিরলাম এবং কমিউনিকেশন, সাসটেইনেবলিটি ও সোর্সিং বিভাগ থেকে তিনটি পদে অফার পেলাম। আমি বেছে নিলাম সোর্সিং ডিপার্টমেন্ট, কারণ এখানে চ্যালেঞ্জ ও শেখার সুযোগ বেশি।

বর্তমানে আমার এক ভাইকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছি, মা ও ছোট বোনের দায়িত্ব নিয়েছি, আর বড় বোনের ছেলের পড়াশোনার খরচও সামলাচ্ছি। নিজের পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

আমার পুরো জীবনটাই ছিল শেখার প্রতি এক অবিরাম আগ্রহ এবং সংগ্রাম। এই পথেই আমি আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চাই।