Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘মা’ একজন নারী, একজন মানুষ

মা’ ছোট্ট একটি শব্দ, আবার অত্যন্ত শক্তিশালী একটি শব্দ৷ ‘মা’ শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে কত দায়িত্ববোধ, কত মায়া-মমতা, কত যত্ন। সন্তান জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, সন্তানের ঢাল হয়ে বেঁচে থাকেন মা। কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মা হওয়ার পর নারীর পরিচয়টা কেন যেন আর বাড়তে দেয়া হয়না। এমনিতেই নারীকে একজন মানুষ হিসেবে দেখার প্রবণতা আমাদের সমাজে খুব একটা নেই, তার উপর মা হওয়ার পর তার পরিচয় শুধুই একজন ‘মা’ হয়ে যায়।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর আত্মপরিচয় কখনোই খুব একটা তৈরি হয়না। তার পরিচয় হয় অমুকের মেয়ে, অমুকের বোন, অমুকের স্ত্রী তারপর একটা সময়ের পর কারো মা হিসেবে। অনেক প্রগতিশীল পরিবার নারীকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করলেও মা হওয়ার পর নারীর অদৃশ্য ডানা দুটো কেটে দেন। সমাজের নিয়ম অনুযায়ী মা হওয়ার পর নারীর কাঁধে থাকা অন্যতম গুরুদায়িত্ব সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। সন্তান জন্মদানের পর নারীর আর লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার অধিকার থাকেনা, চাকরি করার অধিকার থাকেনা, নিজের আত্মপরিচয় তৈরি করার কথা চিন্তা করার অধিকারও থাকেনা।

ফাতেমা আক্তার, পেশায় একজন গৃহিণী। তবে আজ থেকে ১৫ বছর আগে তিনি ছিলেন পেশায় একজন শিক্ষিকা। প্রথম সন্তান গর্ভে আসার পরই পরিবারের কথায় তাকে চাকরি ছাড়তে হয়, যদিও তাকে আশ্বাস দেয়া হয় সন্তান কিছুটা বড় হলেই আবার কাজে ফিরতে পারবেন তিনি। কিন্তু বছর দুয়েকের মাথায় আবার দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর আর কাজে ফেরা হয়নি তার। তার কথায়, ‘ যখন দ্বিতীয় সন্তান মানে আমার মেয়ে হয় তখন পরিবারের সবাই বললো আর চাকরি করে কি হবে এখন মা হয়েছো, ঠিকভাবে এই দায়িত্বটা পালন করো। শুধু শ্বশুর বাড়ি নয়, বাবার বাড়ির সবাই একই কথা বলেছে। এরপর আর চেষ্টা করেও কোনোদিন চাকরিতে জয়েন করতে পারিনি। এখনও ছেলেমেয়েদের প্রতি দায়িত্ব পালন করছি, ওদের মানুষ করছি।’

ফাতেমা আক্তার এর মতো সবার কথায় নিজের পেশা ছেড়ে দেননি উম্মে সালমা। সন্তান জন্মের পরবর্তী সময় কাজ থেকে কিছুটা বিরতি নিলেও আবার ফিরে এসেছেন আত্মনির্ভরশীল হওয়ার লড়াইয়ে। একা হাতে সন্তানের দায়িত্ব পালন করেন আবার পেশাগত দায়িত্বও সামলান। পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা তিনি। তবে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন ও সমাজের বিভিন্ন মানুষের থেকে বিভিন্ন সময় কথা শুনতে হয় তাকে। মাতৃত্ব-বোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেন অনেকে।

এমন চিত্র আমাদের সমাজে ঘরে ঘরে দেখা যায়। মা হওয়ার পর কোনো নারী যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, আত্মপরিচয় তৈরি করতে চায়, তবেই তার মাতৃত্ব-বোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সমাজের তথাকথিত নিয়ম বলে, মা মানে জীবনের সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে শুধু সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। যে মা যতটা বিসর্জন দিতে পারবে সমাজের মাপকাঠিতে সে ততোটা সেরা। আর এই সেরা মা হওয়ার লড়াইয়ে নিজের পরিচয়ই বিসর্জন দিয়ে বসেন নারীরা।

‘গয়না বিক্রি করে, না খেয়ে ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাচ্ছেন মা’, এমন খবর হরহামেশা ঘুরতে দেখা যায় আমাদের চারপাশে। নারীর এই দুরবস্থাকে বাহবা দিয়েই থেমে যাই আমরা। কিন্তু একবার চিন্তা করুন তো, যদি সেই শুরুতেই নারীকে টেনে ধরা না হতো, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে বাঁধা প্রদান না করা হতো তবে খবরের কাগজে এমন খবর পরে নারীকে বাহবা দিতে হতো?

বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। একজন আত্মনির্ভরশীল নারী সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে সন্তানকে লালন-পালন করছে তার থেকেও বেশি আবেগী হয়ে যাবো এই খবর শুনে যে, একজন নারী না খেয়ে সন্তানকে মানুষ করছেন। তবুও আমরা গোঁড়ার দিকে নজর দিবোনা, নারীকে আত্মনির্ভরশীল হতে দিবোনা। নারী তোমার দায়িত্ব সন্তান লালন-পালন করা আবার যখন দুর্দিন আসবে তখনও অসহায়ের মত জীবনযাপন করে দায়িত্ব পালন করতে হবে, তবেই তুমি সেরা মা। আর এই সেরা মা হওয়ার চক্করে নারী ভুলেই যান তিনি একজন নারী, তিনি একজন মানুষ।

অনন্যা/জেএজে