Skip to content

২২ মে, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতাই কি নারীর পথের কাঁটা?

বিভিন্ন বয়সের, পেশার কয়েকজন পুরুষকে জিজ্ঞেস করলাম ‘নারী স্বাধীনতা’ বলতে তারা কি বুঝেন? বেশ কয়েক ধরনের উত্তর আসলো। তার মধ্যে কয়েকটি উত্তর – ‘মেয়েদের স্বাধীনতা মানে উচ্ছন্নে যাওয়া’, ‘রাত বিরেতে ঘুরে বেড়ানো’ ‘ছোটো জামাকাপড় পরা’। এমন আরো হাজারো উত্তর এক নিমিষেই চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারেন সমাজের কিছু পুরুষ। যাদের কাছে নারী স্বাধীনতা মানেই নারীর বিপথে চলে যাওয়া। আদৌও কি তাই?

আমাদের সমাজে নারীর প্রতি হওয়া সব অন্যায় অবিচারের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় নারী স্বাধীনতাকে। ধর্ষণের শিকার নারীকে ধর্ষকের পরিচয় জানতে চাওয়ার আগেই জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তখন তোমার পোশাক কেমন ছিলো, রাতে কেন বাইরে গিয়েছিলে, আরো কত কি। সবশেষে পুরো সমাজ একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্তে আসেন, এই মেয়ে বেশি স্বাধীন ছিলো, যা হয়েছে বেশ হয়েছে।

নারীকে স্বাধীনতা দেয়া মানেই নারী উচ্ছনে চলে যাবে, সমাজের সবথেকে নিকৃষ্ট মানুষ তৈরি হবে এমন চিন্তাভাবনা নিয়ে এখনো আমাদের সমাজের বহু মানুষ টিকে আছে। কিন্তু নারীর স্বাধীনতা বলতে কি শুধুই ছোটো পোশাক, রাত-বিরেতে ঘুরে বেড়ানোকেই যায়। এইদিকটি নারীর স্বাধীনতার কেবল ছোটে একটি অংশ। আর এই অংশটিকেই আমাদের সমাজের ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কিছু মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে যাচ্ছে এবং নারী স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে।

বেশ কিছুদিন আগের ঘটনাই বলা যাক। ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের সহজে কেউ বিয়ে করতে চায় না’ বলে মন্তব্য করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি আরও বলেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশে সোয়া দশটা পর্যন্ত মেয়েরা অফিসে থাকতে পারে না। তার মত একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষও প্রশ্ন তুলেছেন নারী স্বাধীনতা নিয়ে।

এরপর গোপালগঞ্জের একটি ঘটনা দেশ জুড়ে আলোচনায় আসে। রাত পৌঁনে দশটার দিকে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। সেখানেও প্রশ্ন তোলা হয় এতো রাতে কেন মেয়েটি বাইরে ছিলো।

পুরুষ সারারাত ঘরের বাইরে যা খুশি করে চলতে পারলেও সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নারীকে ঘরে ফিরতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অধিকার কেবল পুত্রসন্তানের রয়েছে। লেখাপড়ায় ছেলে যদি স্নাতক সম্পন্ন করেন, মেয়ের দৌড় হতে পারে বড়জোর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। অত্যন্ত দুঃখজনক একটি বিষয় হলো অনেক শিক্ষিত পরিবারে এসব বৈষম্য এখনও চলমান। সেই বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে গেলে নারীকে তুলোধুনা করতে ছাড়েনা পুরো সমাজ৷

তবে শুধু পোশাক কিংবা রাত করে ঘরে ফেরার স্বাধীনতা নয় নারী স্বাধীনতা মানে নারীর অধিকার আদায় করে নেওয়া, নারী স্বাধীনতা মানে নারীর আত্মপরিচয় তৈরি করা, আত্মনির্ভরশীল হওয়া, নারী স্বাধীনতা মানে পরিবারের অমতে বাল্যবিয়ে রুখে দেয়া, নারী স্বাধীনতা মানে সমাজ কিংবা পরিবারের দেয়া শেকল ভেঙে এগোনো৷ কিন্তু নারী স্বাধীনতার আসল মানে বুঝতে পারেন না অনেকেই। শুধু একটি দিকে কেন্দ্র করে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন নারী স্বাধীনতাকে আর একের পর এক অন্যায় অবিচার করেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় নারী স্বাধীনতাকে।

এমন বহু প্রশ্নে অনেক প্রগতিশীল নারীও ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন। আর এতেই তো পুরুষের শান্তি৷ নারী যত বাধ্য হয়ে থাকবে ততো নারীর অধিকার ছিনিয়ে নেয়া যাবে, বৈষম্য চালিয়ে যাওয়া যাবে। বস্তুত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে ব্যবহার করে স্বার্থ হাসিল করতে শিখেছে। তাদের মতে পুরুষের সেবা করা, কথা শুনে চলাই নারীর একমাত্র ধর্ম। নারী স্বাধীন হতে চাইলে তাদের স্বার্থে ঘা লাগে। আর এরপরই তারা নারীকে বোঝানোর চেষ্টায় মত্ত হয়ে থাকে যে, তুমি নারী, স্বাধীনতাই তোমার পথের কাঁটা!

অনন্যা/জেএজে