Skip to content

১১ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই থামছে না গৃহকর্মী নির্যাতন

মানুষ হওয়ার প্রধান শর্ত মনুষ্যত্ব। কারণ মনুষত্বহীন ব্যক্তি কখনোই মানুষ হতে পারে না। যেমনটি ঠিক পশুর ক্ষেত্রে। আমরা জানি, পশুর জীবন আছে কিন্তু বিবেক, বুদ্ধি, মনুষ্যত্ব নেই। ফলে যে বা যারা শুধু জীবিত কিন্তু কোনো বোধ নেই, তারা পশুরই নামান্তর। মানুষের ধর্ম মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, মানবিক হওয়া। তবে মানুষকে যারা শুধু তার সামজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করেন, তারা হীন-মানসিকতার। কুরুচিরপূর্ণ মনোভাবের। কথাগুলো বলতে হলো এই সময়ে এসেও শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের চিত্র দেখে।

খবরে প্রকাশ, ১০ বছরের গৃহকর্মী সুমাইয়া আক্তার। গৃহকর্ত্রী সুযোগ পেলেই তার ওপর চালায় শোষণ, অমানবিক নির্যাতন। খুন্তির ছ্যাঁকা, মারধোরের ক্ষতচিহ্ন, গরম পানিতে ঝলসে দেওয়া, ভেজা কাপড়ে বাথরুমে বন্ধ করে রাখা সবই চলেছে এই ছোট্ট গৃহকর্মীর ওপর। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লার শহরতলির ধর্মপুর এলাকায় বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা করিয়েছে। পরে তাকে কোতোয়ালি মডেল থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় গৃহকর্ত্রী তাহমিনা তুহিনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে বুধবার সন্ধ্যায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শিশুটি জানায়, গত সোমবার রাতে এক কাপ দুধ খাওয়ার অপরাধে গৃহকত্রী নির্যাতন করে গরম পানি ঢেলে দেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঝলসানো পা নিয়ে নগরীর ধর্মপুর ভিক্টোরিয়া কলেজ সংলগ্ন এসআরটি প্যালেসের দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে লাফিয়ে পড়ে সে। পরে কলেজের ছাত্রীদের একটি হোস্টেলে ঢুকে আশ্রয় চায়। শিশুটির অভিযোগ, কাজে দেরি হলেই তাকে মারধর করা হয়।

ভিক্টোরিয়া কলেজের একাধিক ছাত্রী জানান, কয়েক দিন ধরেই তারা ওই বাসা থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ পাচ্ছিলেন। মঙ্গলবারও আওয়াজ পেয়েছেন। ঝলসে যাওয়া পা নিয়ে হোস্টেলে এসে আশ্রয় চায় সুমাইয়া। সে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে। তাকে আশ্রয় দেওয়া হলে তাহমিনা তুহিন এসে তাকে বাসায় নিয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিলেন। তবে স্থানীয়দের বাধায় পারেননি। পরে ছাত্রীরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে (৯৯৯) কল করে বিষয়টি পুলিশকে জানান। পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

১০ বছরের ছোট্ট শিশু পেটের দায়ে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মে নিযুক্ত হয়েছে। কিন্তু তার ওপর এমন অমানবিক নির্যাতন মনুষ্যত্বের মৃত্যু। মানুষ হয়ে মানুষের ওপর এমন রূঢ় আচরণ সত্যিকার অর্থে মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। তাহমিনা তুহিন নিজেও একজন নারী। আর আমরা জানি, নারী মায়ের প্রতীক। কিন্তু সেই মা যখন হিংস্রতার রূপ ধারণ করে তা থেকে মানুষের রক্ষা পাওয়া দায়। বর্তমান সময়ে বিশেষভাবেই লক্ষণীয় যে, মানুষের মধ্যে নূন্যতম ভালোবাসারও উপস্থিতি নেই। সবার মধ্যেই একটা হিংস্র দানব ভর করে আছে। যার ফলে সমাজে ঘটছে অহরহ জটিলতা।

তবে নারী হয়ে আরেক ছোট্ট কন্যা শিশুর ওপর এমন নির্যাতন মানবতার বিপর্যয়। তাহমিনা তুহিন নিজে একজন নারী। তিনিও কারও না কারও মা। ছোট্ট শিশু সুমাইয়া আক্তার পেটের দায়ে কাজ করতে এসে যদি বিরূপ আচরণের শিকার হয় তবে সেই নির্যাতন শুধু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এই নারীর হীন আক্রোশের বহিঃপ্রকাশকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। যে বা যারা এমন কদর্য কাজের অংশী হতে পারেন তাদের দ্বারা সমাজো যেকোনো ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটানো খুবই কিঞ্চিৎ বিষয়। কতটা হিংস্র রূপ নিলে তবেই একটি ১০ বছরের শিশুর শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া যেতে পারে!

নারীদের নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে, সব নারীর জন্য সমানভাবে মানবদরদী হয়ে ওঠা যায় এমন নয়। বরং তহমিনা তুহিনদের মতো অসংখ্য নারী এ সমাজে রয়েছে! এই নারীরা আসলে মানুষের রক্ত-মাংস দিয়ে আদৌ গড়া কিনা মনে প্রশ্ন জাগে! যদি অপর ব্যক্তির কষ্ট পাওয়া দেখে মনে বিকৃত সুখ জাগে তবে সেই প্রত্যাশা কতটা মানবিক সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়। তাই বলতেই হয় তহমিনা তুহিনরা নিপাত যাক। শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে উঠুক। ছোট্ট শিশু সুমাইয়া আক্তারের ভবিষ্যৎ নির্মল হোক। এ সমাজের আধুনিক দাস প্রথার বিড়ম্বনা ঘুচে যাক সর্বাংশে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ