Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গারদ থেকে বলছি

বিজয়ের আনন্দে আমি বিষ খেতে চেয়েছিলাম
বাঁশপাতার শিস আমাকে খেতে দেয়নি
ওরা কেউ খাবারের প্যাকেট তুলে দিতে এসেছিল
ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি
আমার ভেতরে গোটা দুনিয়া ধুয়ে ফেলার রাগ
তখনো এতটুকু কমেনি।

 

যেদিকে তাকায়, মনে হয় যেন আড়াল আবডাল থেকে
বন্দুক তাক করে আছে খানসেনা
যাকে পাবে, তাকেই ঝাঁঝরা করে দেবে
ওরা নৃশংস, ওরা বর্বর, ওরা সব ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে
আমার বউ, আমার মা, ফুলের মতো ফুটফুটে
আমার ছোট ছোট দুটি সন্তান
আমার লক্ষ লক্ষ দেশবাসী। 

 

বিজয়ের আনন্দে মাটি থেকে পাথর তুলে তুলে
বোমা ছোড়ার মতো ছুঁড়েছি
যেভাবে স্টেনগান ছোটাতে শিখেছিলাম
কোনো শত্রুকে  সামনে আর আস্ত রাখবো না

কারো পিঠে লেগেছে, কারো মাথায়, কখনো শূন্যে
কেউ আমাকে বাঁশপেটা করে তাড়িয়েছে
কেউ ছুঁড়েছে গরম জল । 

 

বিজয়ের আনন্দে আমি বিষ খেতে চেয়েছিলাম
দোয়েলের গান আমায় খেতে দেয়নি
পাক সেনার ক্যাম্পে ওরা বেঁধে রেখেছিল আমায়
ওরা খাচ্ছে দেখে, মারণ খিদে পেটে থুতু ছিটিয়েছি

সেদ্ধ গরম ডিম আমার মলদ্বার দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে
চারজন মিলে পর পর পায়ু সঙ্গম করেছে আমার সাথে
চিৎকারে যত করে উঠেছি আর্তনাদ
ঘিরে ঘিরে রাক্ষসের মতো, শুনেছি অট্টহাস্য। 

 

বাঁধন খুলে দিয়ে রাতের অন্ধকারে বলেছে, ' নে..পালা, শুয়োরকা বাচ্চা বাঙালি…'
'জয় বাংলা' বলেছি তবু, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলিনি
এলোপাথাড়ি যখন ছুটছি, পেছন থেকে পর পর ছুটে এসেছে বুলেট
ছিটকে ছিটকে সবাই, গুলি খেয়ে খেয়ে মরেছে

পায়ে লেগেছিলো গুলি, মাঠের মধ্যে পড়েগিয়েছিলাম
আমাকে মৃত ভেবে, ওরা ছেড়ে চলে গেছে। 

 

ভোররাতে অসহ্য যন্ত্রণায়, জেগে উঠে
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নদীর পাড়ে এসেছি
আকাশে জঙ্গী বিমান, নিচে ভেসে চলা আবাল বৃদ্ধ বনিতার লাশ
একটি নৌকো আমায় সীমান্তে এনে দিয়েছে
ভ্যানে তুলে কেউ আমায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছে

রাতে ঘুমের মধ্যে দেখেছি শুধু ধর্ষণ আর ধর্ষণ, আত্মচিৎকার
দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা ঘরবাড়ি
লাশ আর লাশ
ঘুমন্ত রুগীর বেডের পাশে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠেছি
হাসপাতাল থেকে বিকারগ্রস্ত আমি পালিয়ে এসেছিলাম। 

 

বিজয়ের আনন্দে আমি বিষ খেতে চেয়েছিলাম
খেতে পারিনি, নিজেকে খুন করতে পারিনি
নিজের ভেতরে খুন হতে হতে মাথায় জেগে উঠেছে শুধু বিষ
কলকাতার রাস্তায় দেখেছি মিছিল
ভুখা মানুষ আর জনতার বিজয় উল্লাস

দেশ নাকি স্বাধীন হয়েছে
দেশ নাকি মুক্তি পেয়েছে, স্বপ্নের দেশ
আমার জন্য পাগলা গারদ থেকে এসেছে গাড়ি
তুলে নিয়ে গেছে। 

 

পাগল, আমি পাগল
বাউল ক্ষেপার মতো পাগল, দরবেশ ফকিরের মতো পাগল
ভাটিয়ালি গান করা মতিন চাচার মতো পাগল
নিমাই সন্ন্যাস পালা করা বিধুশেখর জ্যাঠার মতো পাগল

ওগো দেশ, ওগো মাটি, গারদের ভেতর
কাঁদতে কাঁদতে আমি তোমার জন্য পাগল
ঘুমের বড়ি খেয়ে একসময় ঝিমিয়ে পড়েছি।