Skip to content

২১শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মুহূর্তেই অঙ্কের সমাধান কে এই গণিত কন্যা?

যদি বলি সে একজন আক্ষরিক অর্থে কম্পিউটার অবাক হবেন? যদি তাকে মানব ক্যালকুলেটর বলি আপনি হয়তো অবাক হবেন। ঠিক তেমনেই একজন গণিতের রানি ছিলেন শকুন্তলা দেবী। তিনি একজন ভারতীয় লেখক এবং মানব কম্পিউটার। গণনা করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণেই বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি লাভ করেন ‘মানব কম্পিউটার’ হিসেবে। 

 

মুহূর্তেই অঙ্কের সমাধান কে এই গণিত কন্যা?

 

শকুন্তলা দেবীর ১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর বেঙ্গালুরুর একটি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম । তাঁর বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখনই তাঁর গণনা করার অসাধারণ প্রতিভা দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁর বাবা একটি সার্কাসে কাজ করতেন। তিনি লক্ষ করলেন, তাসের খেলায় তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, নিজের মেয়েকে হারানো ছিল অসম্ভব। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই জটিল জটিল অঙ্ক কষে ফেলতেন শকুন্তলা। একসময় তাঁর পিতা সার্কাস ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যান ও রোড শো করেন, যেখানে শকুন্তলা তাঁর বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা দেখাতেন।

 

শোনা যায় তিনি গণিতে দক্ষ হওয়ার কারণে দোকানের থেকে পণ্য ক্রয়ের সময়ে তাকে সাথে করে নেওয়া হতো যেখানে অতি দ্রুততর সময়ে মাত্র ৬ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বেশ বড় পরিসরে জ্ঞানীগুণীদের মাঝে মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ পান। বলা বাহুল্য, উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলেই এ গণনা করার অসাধারণ ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। এর দু বছর পর আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো নিজের এই বিশেষ গুণটি তুলে ধরেন তিনি। ১৯৪৪ সালে শকুন্তলা তাঁর পিতার সাথে লন্ডনে চলে যান। দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো নিজের বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন এরপর থেকেই শুরু হয় বিশ্ব জুড়ে তাঁর খ্যাতি অর্জন করার সফর।

 

মুহূর্তেই অঙ্কের সমাধান কে এই গণিত কন্যা?

শকুন্তলা খুব সহজেই তিনের বর্গমূল, উচ্চতর বর্গমূল বের করতে পারতেন এবং বড় বড় সংখ্যা গুণ করতে পারতেন। ১৯৫০ সালের দিকে ইউরোপে এবং ১৯৭৬ সালে নিউইয়র্কেও তিনি তাঁর দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৯৭৭ সালে সাউদার্ন মেথডিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১ অঙ্কের একটি সংখ্যার ২৩তম বর্গমূল মাত্র ৫০ সেকেন্ডে বের করে সকলকে বিস্মিত করে দেন। তাঁর উত্তর ছিল ৫৪৬,৩৭২,৮৯১; যা নিশ্চিত করা হয় তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কম্পিউটার ইউনিভ্যাক-১১০১ এর মাধ্যমে। মাত্র ৫০ সেকেন্ডে শকুন্তলা এ উত্তর দিতে পারলেও বিশেষজ্ঞদের ইউনিভ্যাকে একটি বিশেষ প্রোগ্রাম তৈরি করতে হয় এর সঠিক উত্তর বের করার জন্য। আর ইউনিভ্যাকের এ অঙ্ক কষতে সময় লাগে ৬২ সেকেন্ড।

 

১৯৮৮ সালে শকুন্তলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরকালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্থার জেসন তাঁর এ অসাধারণ প্রতিভার রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করেন। এ তাগিদে জেসন কিছু পরীক্ষাও নেন। জেসন তাঁর প্রাপ্ত তথ্যগুলো দিয়ে ১৯৯০ সালে তার বই ‘ইনটেলিজেন্স’ প্রকাশ করেন। শকুন্তলার আরেকটি বিশেষ দক্ষতা ছিল দিন-তারিখের হিসাব নিয়ে। ১৯৮৮ সালে বার্কলিতে 'জুলাই ৩১, ১৯২০' তারিখে কোন বার ছিল জানতে চাওয়া হলে মাত্র এক সেকেন্ডেই তিনি উত্তর দিয়ে দেন।

 

মুহূর্তেই অঙ্কের সমাধান কে এই গণিত কন্যা?

১৯৮০ সালের ১৮ জুন যুক্তরাজ্যের ইমপেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনে শকুন্তলাকে ১৩ অঙ্কের দু'টি সংখ্যা গুণ করতে দেওয়া হয়। সংখ্যাগুলো পূর্বপরিকল্পিত ছিল না।  এই গুণ করতে তাঁর সময় লাগে মাত্র ২৮ সেকেন্ড। পরদিনই ‘দ্য বুলেটিন' পত্রিকায় তাঁর এই রেকর্ডের কথা প্রকাশ করা হয়। তাঁর এ রেকর্ডের দরুন ১৯৮২ সালে ‘গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। আর সেইসাথে ‘বিশ্বের দ্রুততম মানব কম্পিউটার’ হওয়ার খেতাব পান তিনি। বিস্ময়কর প্রতিভার জন্য তাকে ১৯৮২ সালে ‘গিনেজ বুক অভ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গণনা করার বিশেষ ক্ষমতার পাশাপাশি গাণিতিক বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও যথেষ্ট ধারণা ছিল শকুন্তলার।  

শকুন্তলা দেবী তাঁর জীবদ্দশায় বেশ কিছু বই লিখে গেছেন। এর মধ্যে অন্তত ৬টি বই এরকম ছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মকে গণিত বিষয়ে পড়াশোনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাঁর বইগুলো দেখলে বোঝা যায়, বিভিন্ন গাণিতিক বিষয় যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত, যেমন- ত্রিকোণমিতি ও লগারিদম সম্পর্কেও জানতেন। তাঁর সেরকম কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও এসব বিষয়ে এত দক্ষতা কীভাবে এল, তা নিয়ে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন বই পড়ার মাধ্যমে এসব বিষয়েও পারদর্শী হন। উল্লেখ্য, তিনি জীবদ্দশায় একটি ক্রাইম থ্রিলারও লিখেছেন, যার নাম 'পারফেক্ট মার্ডার'। জ্যোতির্বিদ্যার উপর একটি বই ‘অ্যাস্ট্রোলজি ফর ইউ' লিখেন।

 

মুহূর্তেই অঙ্কের সমাধান কে এই গণিত কন্যা?

 

১৯৬০ সালের মাঝামাঝি পরিতোষ ব্যানার্জির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শকুন্তলা দেবী। তাদের ঘরে একটি মেয়ে হয় যার নাম অনুপমা ব্যানার্জী। বিয়ের কয়েক বছর পরই তাদের বিয়েটি ভেঙে যায়। বলা হয়ে থাকে পরিতোষ সমকামী ছিলেন যার কারণে তাদের বিয়েটি ভেঙে যায়। আর সেজন্যই শকুন্তলা দেবীও সমকামিতা নিয়ে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ হন। ২০০১ সালের একটি তথ্যচিত্র “ফর স্ট্রেইটস অনলি”-তে এই দাবি করা হয়। সেই সময়ে সমকামিতা শুধু সমাজের চোখে নয়, বরং আইনের চোখেও ছিল নিকৃষ্ট অপরাধ। সেই সত্তরের দশকে শকুন্তলা সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটান যেন তাদের মন-মানসিকতা ও জীবনযাপনের ধরন বুঝতে পারেন। এই দীর্ঘ সময়ের গবেষণার ফল ছিল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালিটি’ বইটি। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে।

 

মুহূর্তেই অঙ্কের সমাধান কে এই গণিত কন্যা?

 

বিজ্ঞ এই নারী  ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল ব্যাঙ্গালুরুতে শ্বাসকষ্ট জনিত কারণে ৮৩ বছর বয়সে মারা যান। তিনি বেশ কিছু দিন ধরেই হার্ট ও কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। 

 

প্রবাদে বলা হয় জ্ঞানীর চোখ সবসময় জ্ঞান অন্বেষণে মশগুল থাকে। শকুন্তলা দেবী একটি সাধারণ জীবন যাপনের মাঝে নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এরকম বিজ্ঞ মানুষ শতকে এবং মতান্তরে হাজার বর্ষে একজন আসে।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ