পাহাড়প্রেমীদের নতুন গন্তব্য তুক-অ-দামতুয়া

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

  অনন্যা ডেস্ক

তুক-অ-দামতুয়া, নামের মাঝেই রয়েছে অদ্ভুত এক রহস্যময় আকর্ষণ। তার উপর এটি একটি ঝরনার নাম। এমনিতেই পাহাড়প্রেমীদের ছোট-বড় যে-কোনো ঝরনার প্রতিই রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা। আর সেটা যদি হয় দৈত্যাকার আকৃতির তাহলে তো আর কোনো কথাই চলে না। বান্দরবানের গহিনে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা তুক-অ-দামতুয়া, বছরতিনেক হলো সাধারণ পর্যটকদের ভ্রমণসূচির আলোচনায় এসেছে। দক্ষ গাইডের অভাবে এতদিন যাই যাই করেও যাওয়া হয়নি। তাই বলে হাল ছাড়িনি। নানানজনের কাছে খোঁজখবর নিতে নিতে মিলে যায় দক্ষ গাইডের সন্ধান। রাতের গাড়িতে চড়ে খুব ভোরে গিয়ে নামলাম চকোরিয়া। তারপর চান্দের গাড়িতে আলীকদম উপজেলার সতেরো কিলো নামক জায়গার পথে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে ড্রাইভার নাজেমের গাড়ি চলে।


দশ কিলো থ্যিঙ্কু পাড়া এসেইে কষে একখান ব্রেক। আর্মি চেকপোস্টে সবার নাম ঠিকানা এন্ট্রি করতে গিয়ে বাধল কিছুটা বিপত্তি। অতঃপর নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো গ্রুপের সবার দায়িত্ব নিজ কাঁেধ নেওয়ায় যাবার অনুমতি মিলল। আবারো গাড়ি ছুটল, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাই সতেরো কিলো। গাইড মেন্থন আগেই সেখানে হাজির ছিল। পরিচয়পর্ব শেষে তার পিছুপিছু হাঁটি। যাচ্ছি আদু পাড়ার অভিমুখী। পাড়ায় গিয়ে তার ঘরে বাড়তি মালছামানা রেখে, পাহাড়ের পরম বন্ধু সাইজ মতো বাঁশ নিয়ে ছুটি দামতুয়ার সান্নিধ্য পেতে। দেখতে হলে হাঁটতে হবে। যেমনটা জিততে হলে লড়তে হয়। এই লড়াই কিন্তু স্বভাবিক নয়। যা রীতিমতো মনের সাথে দেহের লড়াই। মাথার উপর ভাদ্রের প্রখর রৌদ্র, দুচোখের সামনে শুধুই উঁচু উঁচু পাহাড়।

হাঁটছি, উঠছি, নামছি মাঝে-মধ্যে ঝিরির পানি চোখে-মুখে ছিটিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছি। ভাগ্যিস, বাতাস ছিল বেশ। সেই সঙ্গে দুষ্ট রাকিব আর মিষ্টি ছেলে মেহেদির বাংলা ছবির প্রয়াত কৌতুক অভিনেতা দিলদার আর রবিউলের মতো অফুরন্ত চুটকির ভিড়ে, দেহের ক্লান্তি পালিয়েছিল পাহাড়ের গভীর খাদে। ট্র্যাকিং করে যাওয়া আর দূর পাহাড়ের নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য মনের শক্তি বাড়িয়েছিল বহুগুণ। নানান হাস্যরস্যের মাঝেই প্রায় তিনঘণ্টা হাইকিং-ট্র্যাকিং শেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কানে ভেসে আসে ঝরনার মাতাল করা রিমঝিম শব্দের ছন্দ। কিন্তু চোখের সামনে চিকন চিকন বাঁশ গাছঘেরা খাড়া পিচ্ছিল পথ। নামতে হবে নীচের দিকে। একটু এদিক সেদিক হলেই সূচালু বাঁশ যে দেহের কোথায় গিয়ে সজোরে ঢুকবে তা কে জানে। এতক্ষণ যে ইফতেখার বাহাদুর ছিল সে এখন বাঁশের ভয়ে পুরোই কুকড়ে গেছে। সব মিলিয়ে ধারেকাছে এসে অস্থির সময়। তবু পেতে হবে দামতুয়ার কোমল পরশ। আমার একশ দশ কেজির দেহটা মানিক ও হাসিবের সহযোগিতায় নীচে নামতে থাকল। নেমে তো পুরাই থ’ হয়ে গেলাম। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। বিশালাকৃতির ঝরনা। দুইপাশ থেকেই পানি গড়িয়ে পড়ছে। পুরাই বুনো এক পরিবেশে দামতুয়া’র অবস্থান। ঝরনার উচ্চতা আনুমানিক প্রায় নব্বই হতে একশো ফিট হবে। বর্ষাশেষে শরৎ-এও তুক-অ-দামতুয়া’র যৌবন কমেনি। সারা বছরই এই ঝরনায় পানির প্রবাহ থাকে।আশ্চর্যের বিষয় বেশি পানি পড়ার পাশ হতে অল্প পানি গড়িয়ে পড়ার অংশের পানি অনেক বেশি ছিল শীতল। বেশ উচ্চতা আর অনেকখানি জায়গাজুড়ে প্রচ- বেগে পানি নেমে আসার কারণে ঝরনার সামনে বিশাল জলাশয় তৈরি হয়েছে। যেখানে অনায়াসেই সাঁতার কেটে জলকেলিতে মাতা যায়। সবাই যখন ডুবসাঁতারে উৎফুল্ল, তখন ছবির ছৈয়াল তুহিন ক্যামেরা হাতে মহাব্যতিব্যস্ত। আর না হয়েইবা কি করার আছে। এরকম নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সান্নিধ্য তো আর চাইলেই পাওয়া যায় না। তাই যতটা সম্ভব ভ্রমণ সঙ্গী ও প্রকৃতির বিশেষ মহূর্ত গুলো ফ্রেম বন্দি করে রাখছে।  


বান্দরবান জেলার অন্যান্য ঝরনার চাইতে, দামতুয়া’র ভৌগোলিক আকৃতিটা ভিন্ন রকম। অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। তুক-অ-দামতুয়া শব্দের অর্থটাও বেশ চমৎকার। এটি একটি মুরং ভাষা। তাদের ভাষায় তুক অর্থ ব্যাঙ, অ অর্থ ঝিরি আর দামতুয়া মানে খাড়া। সব মিলিয়ে ব্যাঙ-মাছ এখান হতে উপরে উঠতে পারে না। তাই এর নামকরণ তুক-অ-দামতুয়া। আমাদের গাইডও ছিল একজন মুরং। বেশ সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবাপন্ন মানুষ। যাই এবার দে-ছুট-এর চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী ঝরনার উৎস দেখতে। আবারো চড়াই-উৎরাই শেষে প্রাকৃতিক সবুজে ঘেরা ঝিরির দেখা পাই। বড় বড় কিছু পাথুরে বোল্ডার পেরিয়ে একেবারে ঝিরির পানিতে পৌঁছাই। বেশ চমৎকার একটা জায়গা। এই ঝিরি থেকেই পানি দামতুয়া’তে যায়। নাম হলো ব্যাঙ ঝিরি। সাধারণত ঝিরির নাম অনুসারেই ঝরনাগুলোর নাম হয়ে থাকে। যেটা ট্র্যেকারদের ভাষায় আপার স্ট্রিম। ব্যাঙ ঝিরির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সময় জ্ঞান ভুলে যাই। টনক নড়ে যখন গাইড হাঁকডাক শুরু করে। কি আর করা, পাহাড়-জঙ্গলের গহিনে একজন গাইডই তখন ক্যাপ্টেন। সুতরাং তার নির্দেশনায় আদুপাড়ার পথ ধরি। ইস আবারো বহুপথ চড়াই-উৎরাই। গাইডের তথ্যমতো প্রায় নয় মাইল। হাঁটঁতে হাঁটঁতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। এমনিতেই পাহাড়ে সন্ধ্যা আসে ঝুপ করে। ওদিকে রফিক ভাইর তাড়া। রাতের রান্নার দায়িত্ব তার ঘাড়েই পড়েছে। কারো পেটেই দুপুরে শুকনো দুই-চার পিছ বিস্কুট ছাড়া তেমন কিছুই পড়েনি। তাই বেচারি ছিল বেশ টেনশনে। যদি খিচুড়ি মজা না হয় তাহলে আজ দে-ছুট-এর দামালেরা না জানি তার মাথায়ই ঢালে। আমি অভয় দেই। কারণ হাঁটছি ত ধীরে ধীরে আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই। কাউকে বুঝতে দিচ্ছি না। উদ্দেশ্য ত ভিন্ন, আজকের রাত পূর্ণিমা। পাহাড়ের নির্জনতায় ভরা জোছনার আলো সঙ্গী করে হাঁটব। পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই আমি মনে মনে কিছুটা এক্সসাইটেড। এক ঢিলে দুই পাখি। এরকম সুযোগ সব সময় মিলে না। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। আকাশ ছোঁয়া পাহাড় টপকিয়ে গোলাকার চাঁদ যখন উঁকি দিল। ওয়াও! নিঝুম অন্ধকার পাহাড়ের চারপাশ আলোকিত হয়ে পড়ল। গাছের পাতাগুলো সবুজের মাঝে সোনালি বর্ণ ধারণ করল। অসাধারণ এক অনুভূতি। তখন সবার মাঝেই বিস্ময়ের আনন্দের ঢেউ খেলল।

এতটাই আপ্লুত যে এখন আর কারো পাড়ায় ফেরার তেমন তাড়াহুড়া নেই। তবু ফিরতে হচ্ছে। পাহাড় ভ্রমণ শুধু যা দেখতে গিয়েছি তা দেখার মাঝেই যেন সীমাবদ্ধ না হয়। ভ্রমণ হলো জীবনের অন্যতম শিক্ষার মাধ্যম। আর তা যদি হয় পাহাড়, তাহলে ত আর কথাই নাই। পাহাড় ভ্রমণে  প্রকৃতি হতে শুরু করে বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজের মানুষগুলোর যাপিত জীবনযাপন হতেও অনেক নৈতিক শিক্ষা লাভ করার সুযোগ রয়েছে। চাদের আলোর অপার্থিব সুখসঙ্গী করে, রাত প্রায় নয়টায় পাড়া’তে ফিরতেই রন্ধন কারিগর ডাইল-চাউল আর ফুঁকনি দিয়ে মাটির চুলায় শুরু করে মহাকসরত। সেই কসরতের কাহিনি আজ আর নাই লিখলাম, তুলে রাখলাম অন্য আরেকদিনের জন্য। ইনশাআল্লাহ আগামী কোনো এক সংখ্যায় খিচুড়ি আর জুম ঘরের গল্প হবে। 


যাবেন কি ভাবে 


ঢাকা হতে সরাসরি বান্দরবানের আলিকদম বাস যায়। টিকেট সঙ্কট হলে কক্সবাজারগামি বাসে চড়ে চকোরিয়া। সেখান হতে মটরবাইক/চান্দের গাড়িতে সরাসরি সতেরো কিলো এলাকায়।


গাইড পাবেন কোথায় 


সতেরো কিলো এলাকার চা’য়ের দোকানীদের সাহায্য নিবেন। অথবা গাইড মেন্থনকেও নিতে পারেন।


খরচ 


সাধারণত জনপ্রতি একদিনে প্রায় ৩হাজার ৫শ টাকা। তবে খরচটা নির্ভর করে অনেকটা নিজের উপর। 


নির্দেশনা


ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি রাখবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের বিধি-নিষেধ অনুসরণ করুন। পর্যপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার, খেজুর, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুদ রাখুন। উলঙ্গ/অর্ধউলঙ্গ কারো প্রতি টিপ্পনী কাটবেন না। 


আবেদন 


অনুগ্রহ করে খাবারের অপচনশীল মোড়কগুলো সঙ্গে নেয়া ব্যাগে করে নিয়ে আসুন। সম্ভব হলে অন্যদের ফেলে দেওয়া মোড়কগুলোও কুড়িয়ে পরিচ্ছন্ন করুন। মনে রাখবেন, এই দেশ আমাদের। সুতরাং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব।