সাইফুল ভূঁইয়ার একগুচ্ছ কবিতা

সাইফুল ভূঁইয়া
সাইফুল ভূঁইয়া, পেশায় চিকিৎসক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। নেশায় কবি। তাঁর কবিতায় উত্তরাধুনিক ধারার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতির সঙ্গে নগরজীবন অনুষঙ্গ মিলে নতুন আবহ তৈরি করে। চিত্রকল্পে-উপমার ব্যবহারে নতুনত্ব চোখে পড়ে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘শ্মশানে নদীর চিতা’, ‘চন্দ্রচূর্ণ’ ও ‘বধির নগরে অবরুদ্ধ অর্কেস্ট্রা’। এছাড়াও তাঁর অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে সেসার ভায়েহোর নির্বাচিত কবিতা।

প্লাটিনাম-ব্লেড এবং রক্তশূন্য-হাত

 

বরফের টেবিলে হীরকের ছোরা
কার ছায়া কাটছো আয়নায়
চেয়েছিলে ধূসর দুটো চোখ
তোমার হাতে আমার দেহখানি।

 

আমি সেই বিষণ্ণ দুপুর, আকাশের চোখ
উড়ছে আকাশে মিগ অথবা চিল
খুলে দাও মুঠো ছোঁ মেরে নিয়ে যাক
থেকেছি অনেক খুদ-কুড়ো খুঁটে খুঁটে।

 

বসে আছে শিশুরা দুপুরের অপেক্ষা
মুঠো মুঠো ধুলো নিয়ে বানিয়েছে নদী
কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে ডুবে প্লাটিনাম-ব্লেড
রক্তশূন্য-হাত আমার দুটো চোখ

 

 


কেউ নেবে না আমায়

 

হাত পেতে কেউ কেউ কিছু পায়নি।
আমাদের শুধু আঁধারের টানাটানি।
সমাধির হৈচৈ ভালো লাগে না
বৃষ্টিতে বসে আছে প্রিয় এপিটাফ।
চলে গেছে সব রোদ,
রিকশায় উড়ন্ত চুলে।
কে এই মায়াময়ী!
লন্ঠন নিয়ে নেমে এলো সড়কে!
আমাদের গলিতে আজ নেমেছে এক চাঁদ
কপালে কাটাদাগ, মন খারাপ।
ইস্পাতের মুখোশ হৈমন্তী বাতাস
পারদের অশ্রু হাঁটছে পিছু পিছু
বিষণ্ণ চাঁদ নেমেছে গলিতে।
হঠাৎ একজন, একদিন হঠাৎ
আড়ালে আবডালে ভাগ চায় কাটা দাগে।
চেয়েও দেখে না কেউ
মানুষ বিক্রির বিজ্ঞাপন।
বসে আছি বাবু সেজে,
মাথায় তেল ফিটফাট চুল।
কেউ নেবে না আমায়, গলিতে নেমেছে চাঁদ।

 

কোথা থেকে উড়ে এলো, এতো ঝরা-পাতা
কে দিলো ডাক! নাম ধরে কে ডাক দিলো...

 

 


মায়া এক মিথ্যা শব্দ

 

পাখিদের মৃত্যু রাষ্ট্রের গোপনীয় বিষয়
চেনা-জানা কতো পাখি আসেনি ফিরে!

 

তবুও আজ হদিস চাই এক অস্থির জোনাকির
যে আমাকে নিয়ে এসেছে পথ দেখিয়ে।

 

জোনাকির খবর রাখে কে, কোন দপ্তর!
কতো জোনাকি নগর ছেড়েছে, ছেড়েছে অমাবস্যা।

 

এতো আলো ভালো লাগে না।
চলো, অন্ধকারের মাঠে...

 

সুখী-নারীর ছদ্মবেশ রেখে
নেমে এসো এই অক্ষিপল্লবে…

 

আমার অক্ষিপল্লব পাখিদের বৃদ্ধাশ্রম,
জোনাকির অন্ধকারের মাঠ।

 

যাদের বলেছি-তোমার জন্য মায়া হয়। ভুল বলেছি।
প্রকৃতপক্ষে বলতে চেয়েছি-আমাকে মায়া করো।

 

যে দেশে মাঠে থাকে না অন্ধকার
জোনাকির মুখে থাকে না হাসি।

 

সেদেশে “মায়া” এক মিথ্যা শব্দ।

 

 


দেখো স্বপ্ন

 

দুটো চোখ ফেলে গেছে কে
মরে গেছে ভেবে।
কার স্বপ্ন চোখে নিয়ে আমি জেগে আছি!

 

মৃত প্রজাপতির ডানা উড়ে যেতে যেতে
ডেকে বলে গেলো-
বেঁচে আছো তুমি, দেখো স্বপ্ন।

 

এমনকি অন্যের চোখে হোলেও,
দেখো স্বপ্ন...

 

 

 

পাখি অথবা উড়োজাহাজ

 

যখন কেউ বিদায় বলে
তার দুটো পাখা গজায়
হয়ে যায়
পাখি অথবা উড়োজাহাজ।
পাখি আর উড়োজাহাজ
নিয়ত বলে-
বিদায়। বিদায়!
আমি কোন্ পাখি অথবা উড়োজাহাজ!

 

 

 

মধুচন্দ্রিমার বিছানা

 

মধুচন্দ্রিমার বিছানায় ঝরছে বৃষ্টি
ঘুমন্ত মুখে উড়ছে তোমার চুল
ঝরনার জল
শরীর বেয়ে নামছে সুতাং নদী
ঘা-ক্ষত গায়ে নিয়ে ভাবছি-
আমি কোন্ মাছ
মেঘালয় থেকে এসেছি শ্যাওলার ঘ্রাণে
ভাটির দেশে আমি যাবো ফিরে।

 

মধুচন্দ্রিমার বিছানায় একটা টিয়া পাখি
ঠোঁটে এক মৃত চিঠি
অশ্রুতে ধুয়ে গ্যাছে সব নীল অক্ষর
জানালায় কাঁদছে লাল-ফ্রক একটা অন্যের-চাঁদ
আমি বসে আছি জাহাজের অপেক্ষায়
চলে যাবো ঘুমন্ত নগরী কালাহারি মরুভূমি
ধুলোর রাজপথে কাঁদছে শিশু
ক্লান্ত উট দরোজায় মুসাফির পা।

 

আমি চলে যাবো।

 

 

 

দুপুর

 

মরে যেও না,
বলছে না আর কেউ।
মরে যাবে জেনেও
ধরছে না কেউ ফোন।
সুইমিংপুলের নীল চোখে
ভাসছে কালো চুল।
সমুদ্রের দুপুরে ভাসছে
মেঘ আর উড়োজাহাজ।
বারান্দায় রোদ চশমা
ডাকছে না আর কেউ।

 

 


উইপোকা

 

চক্রচর উইপোকারা থিতু হবে বলে
দখলে নিলো আমার সবকিছু।

 

পুরনো চিঠি সাদা-কালো ছবি
সযত্নে রাখা মস্তিষ্কখানি।

 

হাতে আঙুলে কলমের নিবে
কবিতা গুলো পোকায় খেয়েছে।

 

সারা রাত কোরাসে গায়
জিপসি কিং এর গান
সুরা ভেবে পান করে
বুকে জমা বিষ।

 

সংসারী হতে এসে
উইপোকারা হয়ে গেলো কবি।

 

 

 

দক্ষিণে যাও

 

পূর্বপুরুষের টানে-
দক্ষিণে যাও,
আরো দক্ষিণে।
জাহাজমারা-পাঙ্খার বাজার-ছাইয়াখালি পাবে।
যেখানে তারা বসে থাকে জোয়ারের পানে।

 

আরো দক্ষিণে যাও,
কৈবর্তদের গায়ের গন্ধে।
গাঙচিলের ডাক আর নোনা হাওয়ার স্বাদে।

 

পূর্বপুরুষের টানে-
আরো দক্ষিণে যাও।
দেখ নিও
জাহাজের কঙ্কাল আর মহিষের শিং,
যদি পাও ভাটার দিন।

 

দক্ষিণ পেরিয়ে,
আরো দক্ষিণে যাও।
আরো দক্ষিণে যাও সূর্য ডোবার আগে।
থেমে যাবে না যদি শোন
সেকান্দর বাদশাহের ডাক।
ওখানে মেঘনাভাসা গ্রাম।
প্রদীপ হাতে বানেসা বেগম
দক্ষিণে খুঁজে যাকে, সুলতান মাঝি নাম।

 

বামনি নদী পেরিয়ে,
আরো দক্ষিণে যাও।
সবাই দক্ষিণে যাবে,
ইলিশ মাছের ঝাঁকে।
পূর্ব পুরুষেরা সেখানেই থাকে।

 

 

 

জলচিত্র

 

দুটো কচুরিপানা ভাসলে
এক বালতি জলে
ব্যঙাচিরা সাঁতার কাটে
লাফিয়ে পড়ে শৈশব।

 

এক আঁজলা নোনাজল পেলে
নাবিকের বুক ভাঙে দীর্ঘশ্বাসে
আন্দামান সাগরে হয় জলোচ্ছ্বাস
কেঁপে উঠে অক্ষিপল্লব।

 

জানালার পাশে রেলগাড়ির সিট পেলে
একটা চন্দ্রনাথ পাহাড় ঘুমায়
সুতাং নদী কলকলিয়ে নামে
আসে জিয়ল মাছের ঢল।