নারীর প্রতি মৌখিক সহিংসতা, প্রতিবাদের সময় এখনই

নারীর প্রতি মৌখিক সহিংসতা, প্রতিবাদের সময় এখনই
নারীর প্রতি মৌখিক সহিংসতা, প্রতিবাদের সময় এখনই
বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক কথা, গালি, তিরস্কারমূলক শব্দই সাধারণত নারীকে অবমাননা অথবা হয়রানি করার জন্য ব্যবহার হয়। সেই সঙ্গে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের  মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে কোন ঝগড়া বিবাদে  নারী বিভিন্ন ধরণের মৌখিক সহিংসতার শিকার হতে হয়।

নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন পেশা, ব্যবসা, রাজনীতি সব জায়গায়ই তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারীকে কোন দৃষ্টিতে দেখা  হচ্ছে? তার কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তাই বা কেমন? কেমন তার প্রতি তিরস্কারমূলক আচরণ এবং মানসিক সহিংসতা ? 

 

বাংলা ভাষায় অধিকাংশ হয়রানিমূলক কথা, গালি, তিরস্কারমূলক শব্দই সাধারণত নারীকে অবমাননা অথবা হয়রানি করার জন্য ব্যবহার হয়। সেই সঙ্গে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে যে নানা ধরণের  মানসিক নিগ্রহের শিকার হতে হয়, তার একটি বড় অংশ হয় নেতিবাচক নানা শব্দের মাধ্যমে কোন ঝগড়া বিবাদে  নারী বিভিন্ন ধরণের মৌখিক সহিংসতার শিকার হতে হয়।

 

হয়ত খেয়াল করেছেন আপনার আশপাশে প্রচলিত বেশিরভাগ গালির সাথে স্ত্রী লিঙ্গের সম্পর্ক। ভাষার মাধ্যমে লৈঙ্গিক বৈষম্য আসলে কি? বাংলাদেশে ভাষাবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকরা অনেক সময়ই ভাষার মাধ্যমে লৈঙ্গিক বৈষম্যের কথা বলে থাকেন।

 

নারীর প্রতি তিরস্কারমূলক কিছু শব্দ?

যেমন ধরুন, বাংলাদেশের সমাজে কিছু প্রচলিত  শব্দ আছে যেগুলো বাংলা অভিধানেও রয়েছে যে শব্দগুলো সাধারণত সবসময়ই মেয়েদের নেতিবাচক ভাবে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন:  এই শব্দগুলো-

 

* মুখরা - যে নারী খোঁচা দিয়ে বেশি কথা বলে 
* ঝগড়াটে - যে ঝগড়া করে কিন্তু কোন আগ্রাসী পুরুষের জন্য এই শব্দ ব্যবহার হয় না
* মাল - আকর্ষণীয় নারী
* বন্ধ্যা - সন্তান নেই যার
* পোড়ামুখী - খারাপ ভাগ্য যার

 

এছাড়া কিছু শব্দ, বাক্য বা প্রবাদ ও প্রবচন রয়েছে যেগুলো দিয়ে নারীর কর্মদক্ষতা বা যোগ্যতা খাটো করা হয়। আবার কিছু শব্দ আছে যেগুলোর পুরুষবাচক শব্দ বাংলা ভাষায় নেই, যেমন ধরুন-

* ডাইনী
* খানকী বা বেশ্যা
* ছিনাল
* কুটনি
* সতী ও অসতী
* নটী

 

অনেক শব্দের মাধ্যমে নারী আহত বা অসম্মানিত  হতে পারে এসব শব্দ নারীকে হেয় করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি তিন জনে একজন নারী সহিংসতার শিকার হন। আমরা দেখেছি যখন কারো ওপর শারীরিক নির্যাতন করা  হয়, তখন তাকে মৌখিকভাবেও নির্যাতন মানে গালিগালাজও করা হয়। আর মানসিক নির্যাতনতো রয়েছেই, যেমন তুমি এটা পারবে না, ওটা করবে না।

 

আবার ধরুন কেউ অফিসে রয়েছে তার ভয় থাকে বস কি বলবে অর্থাৎ এক ধরণের  ফিয়ার  অব ভায়োলেস্স আছে। "শহর-গ্রাম নির্বিশেষে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার সময় নানা ধরণের নেতিবাচক  বা আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার হয়।' যৌন হয়রানি বন্ধের নীতিমালা অধিকাংশ কর্তাব্যক্তির অজানা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অল্প বয়সে মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে যাবার এটি একটি কারণ। সমাজবজ্ঞিানীরা বলছেন, ভাষার মাধ্যমে নারীকে হেয় করা বা হয়রানি করার প্রভাব পড়ে সমাজের  প্রায় সব ক্ষেত্রে  সামাজিক বিভিন্ন কাজে নারীর অংশগ্রহণও এর ফলে কমে যায়।

 

কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি মৌখিক  সহিংসতা

কর্মক্ষেত্রেও নারীর প্রতি মৌখিক সহিংসতার চিত্র আরো ভয়াবহ। একজন নারী নিজের দক্ষতা বা যোগ্যতার গুণে ভালো করলেও তাকে শুনতে হয় বসের সাথে ভালো সম্পর্ক বা দেখতে সুন্দর তাই সে উন্নতি করছে। আশ্চর্যের বিষয় হল নারী সহকর্মীরাও তার নারী সহকর্মীর প্রতি এসকল সহিংসতামুলক আচরণ করে থাকেন অনেক ক্ষেত্রে।

আবার অনেক সময় দেখা যায় একজন নারী সহকর্মীকে প্রশংসা করার ক্ষেত্রেও অবমাননামুলক আচরণ করা হয়/ শব্দ ব্যবহার করা হয়। বিনা অনুমতিতে একজন নারীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফোন করাটাও এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এটা কতোটা সামাজিক আচরণের  মধ্যে পড়ে আমরা সেটা একবারও ভাবি না সহজভাবে গ্রহণ করি, প্রতিবাদ করি না এবং একজন নারী সহকর্মীকে আপনার বলারও অবকাশ নাই যে আপনাকে মিস করছিলাম বলে ফোন করলা ? তারপরও আমরা নারীরা আমাদের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনা। কিন্তু এখনই সময় এই সকল মৌখিক অবমাননার প্রতিবাদ করার। 

 

 সমাজতত্ত্ব কি বলে?

 "সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, ছোটবেলা থেকে মেয়েদের মেয়ে হয়ে এবং ছেলেদের ছেলে হয়ে উঠতে শেখানো হয়। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার একটি বড় কারণ আমরা দেখছি ছেলেদেরকে সামাজিকভাবে শেখানো হয় ছেলেরা কাঁদবে না।

অর্থাৎ তারা আবেগ প্রকাশ করতে শেখে না, যে কারণে তারা সহিংসতা প্রকাশের মাধ্যমে তার আবেগ প্রদর্শন করে। এর পেছনে আমাদের গণমাধ্যমে নারীকে উপস্থাপনের ধরন কেমন তার একটি বড় প্রভাব। অনেক শব্দের মাধ্যমে নারী যে আহত বা অসম্মানিত হতে পারে সে ব্যাপারে ধারণাও থাকে না অনেক মানুষের। কেবল ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন হবার মাধ্যমে যে সমাজে নারী পুরুষের বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনা যেতে পারে। 

 

সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়, নারী হিসেবে আপনার আত্মমর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব আপনারই। এখনই সময় সোচ্চার হবার এবং সকল মৌখিক অবমাননার প্রতিবাদ করার।