Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সন্তানের মন্দ কাজের দায় একা মায়ের নয়

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

‘মা’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মায়ের মতো আপন আর কেউ হয় না। সন্তানকে গর্ভে ধারণ থেকে লালন-পালনের সব ভারই তার ওপর ন্যস্ত থাকে। তারপরও সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে মায়ের যে শারীরিক-মানসিক পরিশ্রম হয়, পরিবারের কাছে তার কোনো মূল্য থাকে না। বরং শিশু সন্তানের কোনো ভুল কিংবা পরিণত বয়সের সন্তানের যেকোনো অপরাধের জন্য সমাজ-পরিবার মাকে দোষ দিয়ে যায়। কিন্তু কেন?

সন্তান কি মায়ের একার ইচ্ছেই পৃথিবীতে আসে? না। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য মায়ের শারীরিক ও মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়। প্রায় নয় মাস কঠোর সাধনার পর মা তার সন্তানকে পৃথিবীর আলোতে নিয়ে আসেন। মায়ের এই কঠিন সাধনা এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিনের পরিচর্যার ফলে তার অপরিসীম কষ্ট সহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়। সন্তান যখন গর্ভে আসে, তখন থেকে মায়ের মনে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার জন্ম হয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে বাবার ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটা ঘটে না। সন্তান যখন কথা বলতে শেখে, আধো আধো বুলি শোনা যায় তার মুখে, তখনই বাবারা হয়তো এক-আধটু কোলে নেয়। আর স্নেহ-মমতাও তখন থেকে জন্ম নেয় বাবার মনে।

মা যেমন সন্তান জন্ম দেন, তেমনি তারই একান্ত সাধনায় পালিত-পালিত হয়। তাই সন্তানের ভালো-মন্দ নিয়ে মাকেই বেশি ভাবতে হয়। উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়। মা বেশি ভাবেন আর উৎকণ্ঠায় থাকেন বলে, শিশু সন্তানের যেকোনো ভুলের জন্য মাকেই পরিবারের আর দশ জন থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়-স্বজনের কটু কথাও শুনতে হয়। এক কথায় সন্তানের সব ধরনের নেতিবাচক কাজের জন্য মাকে দোষারোপ করে সবাই।

সন্তান যেহেতু মায়েরই নাড়িছেঁড়া ধন, তারই শরীরের অংশ, তাই তিনি সব তাচ্ছিল্য, লাঞ্ছনা, অভিযোগ প্রায় নীরবে-প্রতিবাদহীন মেনে নেয়। এই মেনে নেওয়ার মধ্যে থাকে সন্তানের ভবিষ্যৎমঙ্গল চিন্তা, থাকে তার প্রতি অগাধ স্নেহ-ভালোবাসা এবং সমাজের সঙ্গে মনোমালিণ্যে না জড়ানোর সচেতন প্রয়াস। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে, এই সহিষ্ণুতা মায়ের সম্মান ও মানবিকতার চরম অবক্ষয়!

মা-বাবা দুজনের সম্মিলিত ভালোবাসার ফল সন্তান। সুতরাং সন্তানের ভালো-মন্দ, দোষ-গুণ সব বৈশিষ্ট্যের জন্য দুজনকেই সমানভাবে যেমন কৃতিত্ব দেওয়া উচিত, তেমনি দায়ীও করা উচিত। তাই বাবা-মায়ের স্বভাব-চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য কিছুটা হলেও সন্তান বহন করে।

কিন্তু আমাদের সমাজে তেমনটা ঘটে না। একতরফাভাবে সন্তানের সকল দায় মায়ের ওপর বর্তায়। এর প্রধান কারণ, মা সরল, মা কষ্টসহিষ্ণু, মা যুক্তিহীন, নিঃস্বার্থভাবে সমানের মঙ্গলকামনায় নিজেকে নিঃশেষ করে দেন। মায়ের অতিরিক্ত সারল্য ও মমতা তাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠিত রাখে। এই সারল্যের কারণে সন্তানকে সবসময় কঠিন শাসনেও রাখতে পারেন না। সন্তানের প্রতি মায়ের সরলতা তাই মাকেই দংশন করে। পরিবার, স্বজন ও সমাজ যেকোনো ভালো কাজের কৃতিত্বে ভাগীদার হতে পছন্দ করে। সামান্য ভুল থেকে শুরু করে ভয়াবহ কোনো দোষের দায়টুকু মায়ের দিকেই ঠেলে দেয়। অর্থাৎ কোনো সন্তান কোনো কারণে যদি সামান্য বখেও যায়, কিংবা জীবনের কোনো পর্যায়ে গিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্যে দিয়ে জীবন পার করে, তবে পরিবার ও সমাজ মায়ের দিকেই আঙুল তোলে।

সমাজ বলে, মায়ের কারণেই সন্তানের সুশিক্ষা হয়নি, মায়ের কারণে সন্তানের ভালো লেখাপড়াটা হয়নি, মায়ের কারণে সন্তানের জীবন স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সন্তান যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, সুনাম অর্জন করে, তখন পরিবারের অন্য সদস্যরা মাকে সাধুবাদ জানানোরও প্রয়োজন মনে করে না। ব্যতিক্রমও আছে। রাষ্ট্র ও সমাজের কিছু প্রতিষ্ঠান-সংগঠন মাকে মাঝেমাঝে রত্নগর্ভা খেতাব নিয়ে সম্মানিত করে।

সন্তানের মায়ের অন্ধ স্নেহ-ভালোবাসাই মাকে সকল দোষে দোষী করে। এরই ধারাবাহিকতায় সন্তানের ভালো-মন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতার দায় মাকেই দেওয়া হয়। মা-ও মানসিকভাবে এতটা যুক্ত থাকেন যে, অনেকটা জীবনের চিরাচরিত নিয়মের মতো সব হজম করেন। কিন্তু এতে দিনের পর দিন মায়েরা মানসিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন। তাদের সেই মানসিক জটিল অবস্থার খোঁজ পরিবারের বাকি সদস্য থেকে শুরু করে সমাজ-রাষ্ট্র কেউ রাখে না। কিন্তু এমনটা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। এই নিয়মের পরিবর্তন সাধন করা একান্ত জরুরি।

তাই আসুন, মায়ের অতিরিক্ত সারল্য, সহিষ্ণুতা ও ভালোবাসার বিনিময়ে তাকে দোষারোপ না করি। বরং এটা স্বীকার করি, সন্তানও মানুষ। তারাও আলাদ সত্তা, তাদের ভালোমন্দের দায়ও তাদের। একথাও সত্য, মা হিসেবে, জীবনের প্রথম শিক্ষক হিসেবে মায়েরও ভূমিকা রয়েছে। তবে, কেবল একা মায়েরই দায় নয়, সেখানে বাবা থেকে শুরু করে পরিবারের বাকিদেরও সম্পৃক্ত করা জরুরি। তবে প্রতিটি মানবসন্তান যেমন সুকুমারবৃত্তি সম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠবে, তেমনি হবে দায়িত্বশীলও। পরিবারের সম্মিলিত দায় বহনের ভেতর দিয়েই মানব সন্তান বেড়ে উঠুক। আজকের জন্য এই হোক আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

অনন্যা/আরকে