Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পোশাক খাতে কমেছে নারী অংশগ্রহণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরী পোশাক শিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪ ভাগ আসে এই পোশাক খাত থেকে। তৈরী পোশাক শিল্প বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে ষাটের দশকে। তবে সত্তরের দশকের শেষের দিকে রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। এই পোশাক খাতে নারীদের সংখ্যা বেশি থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। নারী শ্রমিকদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও এখন নারীরাই পিছিয়ে পড়ছেন পোশাক খাতে। দিন দিন নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এই খাতে।

 

জানা যায়, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের গোড়াপত্তন নারী শ্রমিকের হাতেই। ব্র্যান্ডিং হিসেবে পোশাক কারখানার মালিকরা এই খাতের ৪০ লাখ নারী শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছিলো। গ্রামের সাধারণ নারীরা যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম তারা সামাজিক ক্ষমতায়নসহ পরিবারের দায়িত্ব নিতে অগ্রগামী হয়েছে এই খাতের কারণে। একসময় এই পোশাক কারখানায় কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য হাজারো নারী ভিড় করতো ঢাকা শহরে। ক্রমে এই সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ইদানিং তা কমছে।

 

সরকারি ও বেসরকারি একাধিক জরিপে এই খাতে নারী শ্রমিক কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, পোশাকশিল্প খাতে বর্তমানে পুরুষ ৫৩.৮২ শতাংশ এবং নারী ৪৬.১৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউএন উইমেনের জরিপমতে, ২০১৮ সালে তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের হার ছিলো ৬০ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিলো ৬৩ শতাংশ। বিবিএস ও বিআইডিএস এর পরিসংখ্যান মতে, পোশাক খাতে ২০১৩ থেকে ২০১৬-১৭ সালে পুরুষের অংশগ্রহণ ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে নারীদের কর্মসংস্থানের গড় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের ব্যবধানে পোশাকশিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ ১০.৬৮ শতাংশ কমেছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় পোশাকশিল্প খাতে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন কমছে। অন্যদিকে পুরুষের অংশগ্রহণ বৃ্দ্ধি পাচ্ছে।

 

 

নারী অংশগ্রহণ হ্রাসের কারণ 

পোশাকশিল্প খাতে নারী অংশগ্রহণ হ্রাসের জন্য একাধিক বিষয়কে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবকে। অন্যান্য শিল্পের মতো পোশাক শিল্পেও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি অনুযায়ী নারীদের জ্ঞান সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। একেই অধিকাংশ নারী শ্রমিক অশিক্ষিত তার ওপর প্রযুক্তিগত জ্ঞানেও নারীরা পুরুষদের থেকে পিছিয়ে। তাই এক্ষেত্রে স্বভাবতই পুরুষরা একটু বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আরেকটি কারণ হচ্ছে আধুনিক উন্নত প্রযুক্তি। আধুনিক কিছু প্রযুক্তি মানুষের শ্রম কমানোর পাশাপাশি কারখানায় শ্রমিকও কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেই কাজ নিজ হাতে করতে হতো এখন তা মেশিন একাই করছে। দুটো মেশিনে সুতা কাটার জন্য একজন নারীর প্রয়োজন হলেও এখন মেশিন নিজেই এই সুতা কাটার কাজটি করছে। এতে সেই নারীর আর কোনো প্রয়োজন থাকছেনা। একারনেও পোশাক খাতে নারীর উপস্থিতি কমছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিডিপি) এর একটি প্রতিবেদন মতে, পুরুষের তুলনায় নারীরা ৩ শতাংশ মজুরি কম পায়। এই আয়ের তারতম্যের কারণেও পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই খাতে আগ্রহ হারাচ্ছে।

 

পোশাক শিল্পে নারীসংখ্যা হ্রাসের আরেকটি কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, অনেক নারীরা এখন নিজেই কর্মসংস্থান গড়ে তুলছেন। নিজেই বিকল্প আয়ের পথ তৈরী করছেন। উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। এটি খুবই ভালো দিক। এতে পোশাক শিল্পে নারী অংশগ্রহণ কমলেও অর্থনীতিতে নারী অংশগ্রহণ কমছেনা। বরং আরো বাড়ছে। নারীর এরকম স্বাধীন কর্মসংস্থান দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

তবে শেষ কারণটি ছাড়া বাকি কারনগুলো নারীকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেবল পোশাক শিল্পেই নয় দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে এরকম পরিস্থিতি একেবারেই কাম্য নয়। তাই পোশাক শিল্পে নারীর সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে কারখানা মালিকদেরও। নারীদের দক্ষ করে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাদের প্রযুক্তিগত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নারীদের বেতন পুরুষের সমান করে দিতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই পেশায় নারীদের সংখ্যা আর থাকবেনা। তাই পোশাক শিল্পে নারীর সংখ্যা টিকিয়ে রাখতে উত্তম পদক্ষেপ গ্রহণের এটিই উপযুক্ত সময়।