২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৬ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

এই পরাজয় আমাদেরও!

image-337-1592732740

এই যে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, যেতে হচ্ছে- এই পরাজয় আমাদেরও! ঢাকায় দিন যাপনের ব্যয় বেড়েছে, খরচের স্বভাবটাও বেড়েছে সেই হারে। দুই দশক আগের মধ্যবিত্ত পরিবার আর আমাদের জীবনধারায় তফাতটা খেয়াল করেছেন?

 

ঘর ভাড়া দিয়েই শুরু করি। আমি এমন একজনকে চিনি, যে প্রতি মাসে ৩২ হাজার টাকা বেতন পায় তিন বছর ধরে, নব-দম্পতি যে বাসায় থাকে সে বাসার ভাড়া বেতনের ৬০ শতাংশ। অথচ সুযোগ ছিল অফিস থেকে খানিকটা দূরে স্বল্প ভাড়ায় থাকার। এই শহরে বেতন যাই হোক, দুই রুম, ড্রয়িং ডাইনিং এটাচ টয়লেট সহ বাসা না হলে চলেই না। আর সাবলেট? নাহ বাবা! রান্নাঘর শেয়ার করতে পারব না ! ছোটবেলায় কোনদিন আলাদা ড্রয়িং রুম ওয়ালা বাসা পাইনি আমি- দীর্ঘ ৭ বছর আমাদের সাথে সাবলেট ছিলেন এক দম্পতি, এক রান্নাঘর শেয়ার করে আমার মা আর আন্টি রান্না করেছেন, প্রয়োজন হয়নি বলেই তারা বাড়তি খরচ করে বাসা নেননি।

 

বাসার আসবাব বিষয়ে আসেন। ওভেন বা ওয়াশিং মেশিন প্রতিটা পরিবারেই এখন দরকারি- মহা দরকারি। আমাদের বাবারা অফিসের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে একটা ফ্রিজ কিনতেন- সপরিবারে আমরা সেই ফ্রিজ কিনতে যেতাম। জুয়েলারি দোকানে যেতাম এসির বাতাস খেতে – এখন আমাদের আছে ইএমআই, পকেটে কার্ড থেকে বিহিসেবে ধার নিয়ে চলে বাজারের সবচে দামি এসি কেনা। ওভেন- সেতো বড়লোক আত্মীয়ের বাসায় তাকিয়ে থাকার জিনিস ছিল। ওয়াশিং মেশিন, স্যান্ডুইচ মেকার, ইলেক্ট্রিক কেটলি, টোস্টার, গিজার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ব্লেন্ডারের সমন্বয়ে তৈরি আমাদের মায়েদের হাত কত অশ্ব-ক্ষমতার মটরে চলত তাই ভাবছি!

 

Advertisements

এবার আসেন কিছু টুকিটাকিতে! একটু চেক করে আসেন তো- মশা তাড়ানোরই কত রকম জিনিস আছে আপনার বাসায়? আমার আছে এরোসল, অডোমস, গুডনাইট এক্সপ্রেস, একটা ইলেকট্রিক ব্যাট আর কয়েল! প্রতিটি ফ্রিজে ফ্রোজেন ফুড, নানা রকম ফুড ইনগ্রেডিয়েন্টস ঠাসা। ২০ টাকার গরম মসলার মিনিপ্যাক না চেনা আমরাই এখন অনলাইনে চিজ, সসেজ, মৌরী, অরিগ্যানো, মেয়োনিজ, সয়া সস, চিলি সস, রেড টমেটো সস, হট টমেটো সস, বার বি কিউ সস কিনি। অথচ আমাদের শৈশবে গোয়ালার দুই পোয়া দুধ কোনদিন বেচে গেলে তবেই সেমাই রান্না হত। ডানো বা হরলিক্সের ডিব্বাগুলোতে কোনদিন দুধ কেনা হয়নি, এগুলা ১০ টাকায় ডিব্বা হিসেবেই কেনা হত। কবে রমজান আসবে আর নিউট্রি-সি কিনে ঘড়ি ফ্রি পাব সেই টেনসনে দিন পার করা আমি এখন ট্যাং এর জার শেষ হওয়ার আগে আরেকটা কিনি!

 

খাওয়ার বিষয়ে আসেন, প্রতি উইকেই আমরা প্রায় পিৎজা খাই। দুই টাকার বাদামের অপেক্ষায় বিকাল কাটানো আমরাই এখন চিকেন ফ্রাই হলেই চলে না শুধু- ফ্রেঞ্চ ফ্রাই না হলে জমে না! এক সপ্তাহ অন্তর আরেক শুক্রবার এক কেজি গরুর মাংস খাওয়া আমরাই সকাল বিকালে নুডুলস পাস্তায় মাংস খাই। বন্ধুদের সাথে আড্ডা মানে রেস্টুরেন্টে হাজারখানেক বিল- প্রতি রোজার ঈদে একবার ১২ টাকার চকবার খাওয়া আমরাই প্রতি স্কুপ ২০০ টাকার আইসক্রিম না খেলে সমাজে চলতে পারি না আবার!

 

এই যে পরিবর্তন- এতোদিন একে ভেবে এসেছি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি! আসলে এসব ফাপা বুলি- আমরা এক ঘোরের মধ্যে ডুবে নিজেদের পরিবার থেকে শেখা অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ভুলে গিয়েছিলাম। এর খেসারত হল এই- দুটো মাস ঘর ভাড়া দেয়ার মত সেভিংস ও নেই- এ এক পরাজয়! করোনার কাছে নয়, এ পরাজয় নিজের মোহের কাছে!

Advertisements