বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবস আজ, শান্তভাবে কথা বলার আহ্বান

আজ ৬ নভেম্বর, বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবস। রাগ, ক্ষোভ কিংবা মতবিরোধের সময় চিৎকার না করে ধৈর্য, সহনশীলতা ও শান্তভাবে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলার সচেতনতা তৈরিতে দিবসটি পালন করা হয়। পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জনসমাগম—সব জায়গায় সংযতভাবে কথা বলার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নানা কারণে মতবিরোধ, মনোমালিন্য কিংবা বিরোধের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় এসব পরিস্থিতিতে নিজের বক্তব্য বোঝাতে কেউ কেউ উচ্চ স্বরে কথা বলেন বা চিৎকার করেন। কিন্তু চিৎকারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই উত্তেজিত না হয়ে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ধৈর্যের সঙ্গে নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং কথোপকথনে সৌজন্য বজায় রাখার আহ্বান জানায় দিবসটি।
উঁচু স্বরে কথা বলা বা চিৎকারের কারণে কেউ আতঙ্কিত হতে পারেন, আবার কেউ নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও অনুভূতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পরিবারের মধ্যে নিয়মিত চিৎকার-চেঁচামেচি শিশুদের মনে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু কী বলা হচ্ছে, তা নয়; কীভাবে বলা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবসের ইতিহাস
২০২১ সালে যুক্তরাজ্যে বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবসের সূচনা হয়। ‘লেটস স্টপ শাউটিং কমিউনিটি ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ নামের একটি সংগঠন মানুষের কথা বলার ধরন নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে। সংগঠনটির মতে, চিৎকার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে। পাশাপাশি এটি মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। এ কারণে শান্তভাবে ও ভেবেচিন্তে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দিবসটির ভাবনা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ব্রিটিশ কাউন্সেলর ইয়াসমিন শাহিন-জাফর। তার মতে, মানুষের কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এবং কথা বলার ধরন অন্য ব্যক্তির নিরাপত্তাবোধ ও গুরুত্ব পাওয়ার অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। কারও সঙ্গে উচ্চ স্বরে কথা বললে তিনি নিজেকে অসম্মানিত কিংবা অনিরাপদ বোধ করতে পারেন। অন্যদিকে, শান্ত ও সংযতভাবে কথা বললে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়।
ধীরে ধীরে এই উদ্যোগের বার্তা পরিবার, স্কুল ও কর্মক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে উদ্যোগটির পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়। বিশেষ করে নিউরোডাইভারজেন্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পায়। নিউরোডাইভারজেন্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শব্দ, উত্তেজনা কিংবা মানসিক চাপের পরিস্থিতিতে চিৎকার অস্বস্তি ও পরিস্থিতির জটিলতা বাড়াতে পারে। তাই তাদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল হওয়া এবং শান্তভাবে যোগাযোগ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রতি বছর ৬ নভেম্বর বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবস পালিত হয়। এ উপলক্ষে স্কুল, অফিস, পরিবারসহ বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নিজেদের কথা বলার ধরন নিয়ে ভাবেন। দিবসটির মূল বার্তা হলো, শান্ত স্বরে কথা বলা শুধু ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়; এটি সুন্দর সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মান এবং সুস্থ যোগাযোগের পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। অনেক সময় কণ্ঠস্বর ও কথার ভঙ্গিতে সামান্য পরিবর্তনই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
যেভাবে পালন করবেন বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবস
বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবস পালনের জন্য বিশেষ কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের কথাবার্তায় কিছু ছোট পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই দিবসটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
প্রথমেই স্বাভাবিকের তুলনায় একটু নিচু ও শান্ত স্বরে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশেষ করে রাগ বা বিরক্তির মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিছুক্ষণ নিজেকে সামলে নিন। এতে উত্তেজনা কমবে এবং পরিস্থিতি বুঝে কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে। আপনার শান্ত আচরণ অন্য ব্যক্তিকেও সংযতভাবে কথা বলতে উৎসাহিত করতে পারে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় সচেতন থাকুন। বিশেষ করে শিশুদের সামনে চিৎকার বা উচ্চ স্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। কোনো বিষয়ে তাদের ভুল থাকলে ধমক না দিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে বুঝিয়ে বলুন। এতে শিশুরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে এবং অন্যের সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলার অভ্যাস শিখবে।
কেউ কথা বলার সময় মাঝপথে বাধা না দিয়ে তার বক্তব্য শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস ভুল বোঝাবুঝি কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে মাথা নেড়ে কিংবা হাসিমুখে বুঝিয়ে দিন যে আপনি তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনছেন। শুধু নিজের বক্তব্য তুলে ধরার পরিবর্তে অন্যের মতামতকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বাড়িতে শান্ত পরিবেশ তৈরির জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা রাখতে পারেন, যেখানে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন কিংবা অন্য কোনো যন্ত্রের উচ্চ শব্দ থাকবে না। পরিবারের সদস্যরা সেখানে বই পড়তে পারেন, বিশ্রাম নিতে পারেন কিংবা কিছুক্ষণ নীরবে সময় কাটাতে পারেন। এতে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুন্দর যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি হবে।
কর্মক্ষেত্রেও সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় সংযত ভাষা ব্যবহার করা জরুরি। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সবার সামনে উচ্চ স্বরে তর্কে জড়িয়ে না পড়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আলাদা করে আলোচনা করুন। অন্যের মতামতকে সম্মান করুন এবং নিজের বক্তব্য যুক্তি ও ধৈর্যের সঙ্গে তুলে ধরুন। এতে কর্মপরিবেশ আরও ইতিবাচক ও সহযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় টেলিভিশন, মোবাইল ফোন কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের শব্দ কমিয়ে রাখতে পারেন। অতিরিক্ত চিৎকার-চেঁচামেচি রয়েছে এমন অনুষ্ঠান এড়িয়ে শান্ত গান কিংবা পডকাস্ট শুনতে পারেন। এতে ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি বাড়ি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশও তুলনামূলক শান্ত থাকবে।
বিশ্ব চিৎকার বন্ধ দিবস মূলত মনে করিয়ে দেয়, যোগাযোগের ক্ষেত্রে উচ্চ স্বরের চেয়ে ধৈর্য, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সম্মানের গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে পরিবর্তন আনতে পারলে পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে আরও সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।



