সারা জীবন ইসলামের পথেই ছিলেন, অথচ জানতেন না: মার্কিন তরুণী অ্যাঞ্জেলা

ধর্মীয় অনুসন্ধান, শৈশবের আধ্যাত্মিক শিক্ষা আর দীর্ঘদিনের আত্মজিজ্ঞাসা—সবকিছুর উত্তর খুঁজে পেয়েছেন ইসলামে। ক্যাথলিক আবাসিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ, শেষ পর্যন্ত পবিত্র কোরআন পাঠের মধ্য দিয়ে নিজের বিশ্বাসের নতুন পরিচয় খুঁজে পান যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী তরুণী অ্যাঞ্জেলা।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকায় বেড়ে ওঠা অ্যাঞ্জেলার শৈশব কেটেছে আধ্যাত্মিক পরিবেশে। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে সৃষ্টিকর্তা, প্রার্থনা ও নৈতিক জীবনযাপনের নানা শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। তবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ইসলাম ধর্মের শিক্ষার সঙ্গে নিজের শৈশবের বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের মিল খুঁজে পান তিনি।
সম্প্রতি ‘এবাউট ইসলাম’কে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের ধর্মীয় জীবন ও ইসলাম গ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন অ্যাঞ্জেলা শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, তার দাদা-দাদি সব সময় সৃষ্টিকর্তার কথা বলতেন এবং নানা গল্পের মাধ্যমে তাকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তাদের কাছে প্রার্থনা ছিল কেবল নির্দিষ্ট সময়ের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অ্যাঞ্জেলার বয়স যখন ১০ বছর, তখন তাকে অন্য আদিবাসী শিশুদের সঙ্গে একটি ক্যাথলিক আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দুই বছর কাটালেও ক্যাথলিক ধর্মের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। বরং ওই অভিজ্ঞতার পর নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি হয় তার মনে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাদের পরিবার আধ্যাত্মিক জীবন অনুসরণ করলেও সেই বিশ্বাসের কোনো নির্দিষ্ট নাম ছিল না। পরিবারের প্রবীণরা শেখাতেন, মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ এমন হওয়া উচিত, যেন সেটিও একটি প্রার্থনা। সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে সৎভাবে জীবনযাপন করাকেই তারা গুরুত্ব দিতেন।
কিন্তু বড় হওয়ার পর যখন অন্যরা তার কাছে ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাইত, তখন উত্তর দিতে পারতেন না অ্যাঞ্জেলা। নিজের বিশ্বাসকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো ধারণা তার ছিল না। সেই জিজ্ঞাসা থেকেই একসময় বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়।
অ্যাঞ্জেলা জানান, একে একে বিভিন্ন ধর্মের মতবাদ ও বিশ্বাস সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তবে অনেক ধর্মীয় ধারণাই তার কাছে অস্পষ্ট মনে হতো। বিশেষ করে সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কিছু বিশ্বাস তার শৈশবে পাওয়া শিক্ষার সঙ্গে মেলাতে পারতেন না। এভাবে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে একজন মুসলিমের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কথোপকথনের সময় ইসলাম সম্পর্কে এমন কিছু বিষয় জানতে পারেন, যেগুলোর সঙ্গে নিজের পারিবারিক শিক্ষা ও জীবনযাপনের আশ্চর্য মিল খুঁজে পান। বিষয়টি তাকে ইসলাম সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহী করে তোলে।
এরপর ইন্টারনেটে ইসলামবিষয়ক বিভিন্ন লেখা পড়তে শুরু করেন অ্যাঞ্জেলা। তার কাছে ইসলামের অনেক শিক্ষা পরিচিত ও অর্থবহ মনে হতে থাকে। বিশেষ করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস, প্রার্থনা এবং জীবনযাপনের নানা নির্দেশনার মধ্যে তিনি তার দাদা-দাদির কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার প্রতিফলন দেখতে পান।
ইসলাম সম্পর্কে জানার এই আগ্রহ আরও বাড়ে একটি মুদি দোকানের পুরোনো বইয়ের সংগ্রহ থেকে। সেখানে দাতব্য কাজে অর্থ ব্যয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য রাখা বইয়ের স্তূপে ইসলামবিষয়ক কয়েকটি বই দেখতে পান তিনি। বইগুলো কিনে বাড়িতে নিয়ে পড়তে শুরু করেন। এরপর সিদ্ধান্ত নেন, এবার সরাসরি পবিত্র কোরআন পড়বেন। কোরআন পাঠের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অ্যাঞ্জেলা বলেন, শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি ও দ্বিধা কাজ করছিল। কারণ, কোরআনের কিছু বিষয় তার দাদার কাছ থেকে শোনা ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছিল না। কিছু বিষয় নতুন ও ভিন্ন মনে হলেও তিনি পড়া চালিয়ে যান।
একপর্যায়ে কোরআনের শিক্ষা ও নিজের দীর্ঘদিনের আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যে গভীর সম্পর্ক খুঁজে পান তিনি। তার উপলব্ধি হয়, সারা জীবন ধরে যেসব বিশ্বাস ও চর্চা অনুসরণ করে এসেছেন, সেগুলোর অনেক কিছুই ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অ্যাঞ্জেলার ভাষায়, ‘আমি তো সারা জীবন ধরেই এসব করে আসছি। অথচ কখনো জানতামই না।’
দীর্ঘদিনের ধর্মীয় অনুসন্ধান, নানা প্রশ্ন ও কোরআন পাঠের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় তার। শেষ পর্যন্ত ইসলামকেই নিজের ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন এই মার্কিন তরুণী। তার কাছে ইসলাম গ্রহণ কেবল নতুন একটি ধর্মীয় পরিচয় পাওয়া নয়, বরং শৈশব থেকে লালন করা আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা।



