৩ নভেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

সুদের কারবারে জড়িত পাত্রের কাছে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি বৈধ? ইসলাম কী বলে

সুদভিত্তিক-ব্যাংকে-চাকরি-করা-ব্যক্তিকে-বিয়ে

মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক মা-বাবাই এমন একজন জীবনসঙ্গী প্রত্যাশা করেন, যিনি হবেন সৎ, দায়িত্বশীল, চরিত্রবান ও ধর্মপরায়ণ। কারণ বিয়ে কেবল দুটি মানুষের সম্পর্কের সূচনা নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে নতুন একটি পরিবার। তাই পাত্র নির্বাচনের সময় তার পারিবারিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও উপার্জনের উৎস যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু কোনো পাত্রের উপার্জনের সঙ্গে যদি সুদি লেনদেন বা হারাম ব্যবসার সম্পৃক্ততা থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দ্বিধায় পড়েন অভিভাবকেরা। পাত্রের অন্যান্য গুণ ভালো হলেও সুদের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তার কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত? এমন বিয়ের শরয়ি বৈধতা কী? সংসারজীবনে হারাম উপার্জনের প্রভাবই বা কতটুকু? ইসলামের নির্দেশনা ও আলেমদের মতামতের আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।

ছবি:সংগৃহীত

১. সুদ সম্পর্কে ইসলামের কঠোর নির্দেশনা

ইসলামে সুদ বা রিবা অত্যন্ত গুরুতর কবিরা গুনাহ। কোরআন ও হাদিসে সুদের লেনদেন থেকে বিরত থাকার বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করে বলেন—

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

অর্থ: ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫)

Advertisements

সুদ পরিহারের বিষয়ে মুমিনদের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৮)

শুধু সুদ গ্রহণকারীই নয়, সুদের লেনদেনে সরাসরি সহযোগিতাকারীদের ব্যাপারেও হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের চুক্তি লেখক এবং দুই সাক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘তারা সবাই (গুনাহের ক্ষেত্রে) সমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)

অর্থাৎ সুদকে সাধারণ কোনো আর্থিক লেনদেন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইসলামে এটি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।

২. সুদে জড়িত পাত্রকে বিয়ে করা কি শরিয়তসম্মত?

এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, সুদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং দ্বিতীয়ত, এমন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পন্ন বিয়ের বৈধতা।

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি সুদের কারবারে জড়িত থাকলেই তার সঙ্গে সম্পন্ন বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। অর্থাৎ সুদে জড়িত থাকা এবং বিয়ের আকদ অবৈধ হওয়া এক বিষয় নয়। তবে জেনেশুনে সুদের মতো গুরুতর হারাম কাজে যুক্ত থাকা একজন মানুষের দ্বীনদারি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

বিশেষ করে পাত্র যদি সুদের নিষিদ্ধতা সম্পর্কে জানার পরও সেই কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী হন এবং তা থেকে ফিরে আসার কোনো মানসিকতা না দেখান, তাহলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এ প্রসঙ্গে সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর একটি ফতোয়ায় সুদভিত্তিক ব্যাংকে কর্মরত পাত্রের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, একজন ব্যক্তি সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করেন এবং বিকল্প চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সেই কাজ ছাড়তে চান না। এমন ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া উচিত কি না?

জবাবে তিনি ওই চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় এমন পাত্রের কাছে মেয়েকে বিয়ে না দেওয়াকে অধিকতর সমীচীন বলে মত দেন। তাই অভিভাবকদের উচিত পাত্রের পেশা ও আয়ের উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া। পাশাপাশি তিনি হালাল উপার্জনের পথে ফিরতে আগ্রহী কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা।

৩. পাত্র নির্বাচনে সম্পদের চেয়ে দ্বীনদারি গুরুত্বপূর্ণ

বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রের অর্থবিত্ত, সামাজিক মর্যাদা কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে তার দ্বীনদারি ও চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ

অর্থ: ‘তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন পাত্র নিয়মিত নামাজ আদায় করেন কি না, হালাল-হারামের পার্থক্য মেনে চলেন কি না, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন এবং নিজের দায়িত্ব পালনে কতটা আন্তরিক—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি। শুধু আর্থিক সচ্ছলতা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেখে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধান মেনে চলতে সচেষ্ট এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল, তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

৪. হারাম উপার্জনের প্রভাব পড়বে কি সংসারে?

ইসলামে হালাল উপার্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ মানুষের খাদ্য, জীবনযাপন ও ইবাদতের সঙ্গে উপার্জনের পবিত্রতার সম্পর্ক রয়েছে। হারাম উপার্জন আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে এবং জীবনের বরকত নষ্ট করতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

তবে স্বামীর উপার্জনে হারামের সংশ্লিষ্টতা থাকলেই স্ত্রীর ভরণপোষণের প্রতিটি অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায়—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। উপার্জনের ধরন, অর্থের প্রকৃত উৎস এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী শরয়ি বিধান ভিন্ন হতে পারে।

এ কারণে কোনো ব্যক্তি সুদের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁর উপার্জনের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা জরুরি। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির শরয়ি সমাধান জেনে নেওয়া উচিত।

বিয়ের আগে যে বিষয়টি গুরুত্ব দেবেন

মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবন নিরাপদ ও সুন্দর করার দায়িত্ব অভিভাবকদের। তাই বিয়ের প্রস্তাব এলে শুধু পাত্রের আয়, চাকরি কিংবা সামাজিক অবস্থান দেখলেই হবে না; তাঁর ধর্মীয় অনুশীলন, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং উপার্জনের বৈধতাও যাচাই করতে হবে।পাত্র যদি সুদের মতো গুরুতর হারাম কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে তাঁর অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। তিনি অনুতপ্ত কি না, তওবা করে হালাল পেশায় ফেরার আন্তরিক চেষ্টা করছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।সবশেষে বলা যায়, সুদে জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন হলেই তা অবৈধ হয়ে যায় না; তবে এমন পাত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারি, চরিত্র ও হালাল উপার্জনকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মেয়ের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই অভিভাবকদের সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

Advertisements