ঘিয়ের ব্যবসা থেকে ১৮৫ ধরনের মিষ্টি, চার প্রজন্মের ঐতিহ্যে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার

ব্রিটিশ আমলে ঘিয়ের ব্যবসা দিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। সময়ের পরিক্রমায় সেই ব্যবসা বিস্তৃত হয়ে জায়গা করে নিয়েছে মিষ্টির জগতে। বর্তমানে প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি তৈরি করছে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার। সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে প্রায় ৪৫টি শাখা। চার প্রজন্মের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রায় তিন শ কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের বর্তমান পরিচালকদের একজন দীপক কুমার ঘোষ জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটিশ আমল থেকেই দুধ ও ঘির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুরান ঢাকায় তাঁদের প্রথম দোকানের নাম ছিল ‘দেশপ্রিয় মিষ্টান্ন ভান্ডার’। সেখানে ঘিয়ের পাশাপাশি সকালের নাশতা, দুধ চা ও বিশেষ ধরনের প্রাণহরা মিষ্টি বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রায় শত বছরের পুরোনো এই প্রাণহরা সাগরকলা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হতো। তবে দক্ষ কারিগরদের অনেকে মারা যাওয়ায় আগের সেই প্রস্তুতপ্রণালি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালে প্রয়াত রমেশচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে রাজধানীর কলাবাগানে যাত্রা শুরু করে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার। ঘোষ পরিবারের সদস্য প্রমিত কুমার ঘোষের ভাষ্য অনুযায়ী, ঠাকুরদার বাবার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত চার প্রজন্ম এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে পরিবারের ২৪ সদস্য মিলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে রসগোল্লা, লালমোহন, কালোজাম, চমচম, ক্ষীর চমচম, রসমালাই, সরমালাই, ক্ষীরমালাই, মালাই চপ, ইন্দ্রাণী ভোগ ও জাফরানি ভোগসহ প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়। কিছু মিষ্টি নির্দিষ্ট মৌসুমে পাওয়া যায়। যেমন শীতকালে ক্ষীর কদমের চাহিদা বাড়ে। আবার কমলার খোসা বেটে ছানার সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি কমলাভোগ শুধু কমলার মৌসুমেই প্রস্তুত করা হয়।
মিষ্টির স্বাদ ও মান ধরে রাখতে দুধ, ছানা, ক্ষীর, মাওয়া এবং চিনির মানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অধিকাংশ কাঁচামাল মুন্সিগঞ্জ থেকে এনে ঢাকার কলাবাগান ও ইংলিশ রোডের কারখানায় মিষ্টি তৈরি করা হয়। প্রমিত কুমার ঘোষের দাবি, মিষ্টি তৈরিতে কোনো প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয় না। তবে কয়েক ধরনের মিষ্টিতে খাবারের রং ব্যবহার করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রায় তিন শ কর্মীর মধ্যে শতাধিক কর্মী সরাসরি মিষ্টি তৈরির কাজে যুক্ত। প্রতিটি মিষ্টির জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা। বর্তমানে প্রায় ৪৫টি শাখা পরিচালনার পাশাপাশি আরও কয়েকটি শাখা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
তবে ব্যবসার বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে চ্যালেঞ্জও। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নকল মিষ্টি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। প্রমিত কুমার ঘোষ জানান, এ ধরনের প্রায় ৩০০টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।
চার প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ও নতুন মিষ্টির সংযোজনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার। ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো মিষ্টির প্রস্তুতপ্রণালি ও কারিগরদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করাই এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।



