নিজের জমি বিক্রি করে বৃদ্ধাশ্রম গড়েছেন নিরাপত্তাকর্মী রফিকুল ও কল্পনা দম্পতি- যাঁদের সন্তান ফেলে গেছে, তাদেরই মা-বাবা বানিয়ে নিয়েছেন রফিকুল

নিজের মা-বাবাকে সেবা করার সুযোগ পাননি। ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন তাঁদের। সেই শূন্যতা আজও বয়ে বেড়ান ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার রফিকুল ইসলাম। তবে নিজের জীবনের সেই অপূর্ণতাকেই অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর প্রেরণা বানিয়েছেন তিনি। রাস্তায় পড়ে থাকা, স্বজনদের অবহেলায় আশ্রয়হীন কিংবা সন্তানদের ফেলে যাওয়া প্রবীণ মানুষদের আপন করে নিয়েছেন। আর এই মানবিক যাত্রায় তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী স্ত্রী কল্পনা আক্তার।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার প্রত্যন্ত চরকামটখালী গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘মাতৃছায়া সমাজকল্যাণ সংস্থা ও বৃদ্ধাশ্রম’। সেখানে আশ্রয় পাওয়া অসহায় প্রবীণদের নিজের মা-বাবার মতোই আগলে রাখছেন এই দম্পতি।
রফিকুল ইসলামের ভাষায়, ‘আমার মা-বাপ বাইচ্চা থাকলে তো তাঁদের পালতাম। আমি ছুডুবেলাই মা-বাপ হারাইছি, মা-বাপের সেবা করতে পারি নাই। তাই রাস্তায় ফালায় যাওয়া মা-বাপরে নিজের বাপ-মা মনে কইরা পালতাছি।’
মা-বাবাকে হারানোর কষ্ট থেকেই মানবিক উদ্যোগ
দীর্ঘ দুই দশক হাসপাতালে চাকরি করেছেন রফিকুল ইসলাম। কর্মজীবনে খুব কাছ থেকে দেখেছেন অসহায় মানুষের দুর্দশা। বিশেষ করে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া অনেক প্রবীণকে হাসপাতালের বারান্দা কিংবা রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। কারও পাশে ছিল না পরিবার, কারও খোঁজ নিত না সন্তান। এসব দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একসময় সিদ্ধান্ত নেন, নিজের সামর্থ্য যতটুকুই থাকুক, অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবেন।
সেই ভাবনা থেকে ২০১৮ সালে নিজের আট শতাংশ জমিতে একটি টিনশেড ঘর তৈরি করে শুরু করেন আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম। ২০১৯ সাল থেকে সেখানে আশ্রয় পেতে থাকেন পরিচয়হীন ও স্বজনদের অবহেলার শিকার প্রবীণেরা। পরে ২০২২ সালে অ্যাপেক্স ক্লাব অব ময়মনসিংহ আশ্রয়কেন্দ্রটির জন্য একটি আধা পাকা ঘর নির্মাণ করে দেয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মাতৃছায়ায় আশ্রয় পেয়েছেন ৩৩ জন প্রবীণ। তাঁদের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন এবং চারজন ফিরে গেছেন পরিবারের কাছে। বর্তমানে সেখানে রয়েছেন ১৪ জন নারী, দুজন পুরুষ ও একটি শিশু।
অন্যের কাছে হাত পেতে চলে মা-বাবার সেবা
আশ্রয়কেন্দ্রটি পরিচালনা করতে প্রতিদিনই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় রফিকুলকে। এত মানুষের খাবার, পোশাক, ওষুধ ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো সহজ নয়। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। কখনো পরিচিত মানুষের কাছে সাহায্য চান, কখনো সংগ্রহ করেন পুরোনো কাপড়। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় চলে আশ্রিতদের খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা। রফিকুল বলেন, ‘মাইনসের কাছ থাইক্কা পুরান কাপড় চায়া আনি আমার মা-বাবার লাগি। ১০ জনের সহায়তায় খাওনের ব্যবস্থা করি। আমার যতটুকু কুলায়, ততটুকু তাঁদের জন্য করছি।’
শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবেন তিনি। তাঁর ইচ্ছা, যত দিন বেঁচে থাকবেন, অসহায় মানুষগুলোর সেবা করে যাবেন। আর তাঁর মৃত্যুর পর এই দায়িত্ব পালন করবেন তাঁর সন্তান।
মাতৃছায়ায় আশ্রয় পাওয়া মানুষগুলোর গল্প
মাতৃছায়ার প্রতিটি মানুষের জীবনের পেছনে রয়েছে আলাদা এক গল্প। কারও জীবনে রয়েছে স্বজন হারানোর বেদনা, কারও রয়েছে আপনজনের অবহেলার কষ্ট। মাত্র এক মাস আগে চার বছরের মেয়ে মাইশাকে নিয়ে আশ্রয় পেয়েছেন নাসিমা বেগম (৩৪)। অসুস্থ শরীর, একটি চোখ নেই। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে রাস্তার পাশে পড়ে ছিলেন তিনি। একদল তরুণ তাঁদের উদ্ধার করে মাতৃছায়ায় নিয়ে আসেন। এখন ছোট্ট মাইশা আশ্রয়কেন্দ্রের আঙিনায় ঘুরে বেড়ায়।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের বাসিন্দা এক প্রবীণ নারী, যিনি ‘তারার মা’ নামে পরিচিত, নিজের বয়স নব্বইয়ের বেশি বলে জানান। তাঁর দাবি, স্বামী মহর আলী ফকির মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। নিজের কোনো সন্তান না থাকায় দেবর ও তাঁর সন্তানেরাই দেখাশোনা করতেন। প্রায় তিন বছর আগে স্বজনেরা তাঁকে মাতৃছায়ায় রেখে যান। এখনো বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটে তাঁর। স্বজনদের কথা মনে পড়লেই বলেন, ‘দেবরের মেয়ে হোসনাকে ফোন দাও, সে আইসা লইয়া যাইব।’
সন্তানদের অবহেলায় আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রমে
সগ্রাদী গ্রামের জরিনা বেগমের বয়স ৭৫ বছর। তাঁর দুই ছেলে মারা গেছেন। অভিযোগ, পুত্রবধূ ও নাতিরা দেখাশোনা না করায় শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জরিনা। আঁচলে মুখ ঢেকে বলেন, ‘ওরা আমারে ভাত দেয় না। আমারে বাড়িত জায়গা দিল না থাহনের।’
আরেক প্রবীণ তহুরুন্নেছা জানান, প্রায় ছয় মাস আগে পুলিশ তাঁকে রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার করে মাতৃছায়ায় নিয়ে আসে। তাঁর দাবি, একদিন মেয়ের সঙ্গে বাড়ি যাওয়ার পথে তাঁকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া হয়।
একসময় সড়ক বিভাগে শ্রমিকের কাজ করতেন শাহজাহান মিয়া (৬৫)। কঠোর পরিশ্রম করে বড় করেছেন ছেলেমেয়েদের। অথচ জীবনের শেষ সময়ে তাঁর ঠিকানা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রম।
শাহজাহান জানান, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে বাড়িতে থাকার সুযোগ হয়নি। ছেলে মাঝেমধ্যে ফোন করলেও এখন তিনি মাতৃছায়াতেই থাকেন। তবে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই তাঁর।
স্বামীর মানবিক কাজে সমান সঙ্গী কল্পনা
শুধু রফিকুল নন, আশ্রিত মানুষগুলোর সেবায় দিনরাত পরিশ্রম করছেন তাঁর স্ত্রী কল্পনা আক্তারও। খাবার তৈরি থেকে শুরু করে অসুস্থদের দেখাশোনা, পোশাক পরিষ্কার কিংবা দৈনন্দিন যত্ন—সবকিছুতেই স্বামীর পাশে রয়েছেন তিনি।
কল্পনা বলেন, ‘অনেককে সন্তানেরা রেখে গেছেন, অনেকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা। মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও আমরা মা-বাবার মতো তাঁদের আদর করি। আমাদের কাছে জায়গার সমস্যা নাই। সামর্থ্য অনুযায়ী লালন করছি।’
নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আশ্রিত মানুষগুলোর যত্নে কোনো কমতি রাখতে চান না এই দম্পতি।



