৩ নভেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

অভাব-অনটন দূর করতে যে দোয়া ও আমল করতে পারেন

4c354f4cad82aa9cf6fceac2fcf3825b

জীবনে আর্থিক সংকট ও অভাব-অনটনের মুখোমুখি হতে হয় অনেককেই। কখনো সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে কষ্ট হয়, কখনো ঋণের চাপ বাড়তে থাকে। আবার পর্যাপ্ত পরিশ্রম করার পরও অনেক সময় উপার্জনে প্রত্যাশিত বরকত পাওয়া যায় না। এসব পরিস্থিতিতে মানুষের মনে হতাশা ও দুশ্চিন্তা ভর করতে পারে।

ইসলামের শিক্ষা হলো, রিজিকের প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ তাআলা। মানুষের জীবনে সচ্ছলতা ও অভাব—দুটিই পরীক্ষার অংশ হতে পারে। তাই কঠিন সময়ে ধৈর্য হারানো উচিত নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, হালাল পথে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং নিয়মিত দোয়া ও ইস্তিগফার করা জরুরি।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অভাব দূর করা, রিজিকে বরকত পাওয়া এবং আর্থিক সংকট থেকে মুক্তির জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও আমলের নির্দেশনা রয়েছে। সেগুলো জেনে নেওয়া যাক।

১. আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন

অভাবের সময়ও আল্লাহর দেওয়া ছোট-বড় নেয়ামতের কথা স্মরণ করা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞ বান্দাদের জন্য নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন—

Advertisements

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

অর্থ: ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা করেছিলেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত ৭)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আর্থিক সংকটের মধ্যেও তাঁর দেওয়া নেয়ামতগুলোর জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত। পাশাপাশি হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

২. দারিদ্র্য ও অপমান থেকে বাঁচার দোয়া

অভাব-অনটন, স্বল্পতা, অপমান এবং অন্যায়-অত্যাচার থেকে নিরাপদ থাকার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ، وَالْقِلَّةِ، وَالذِّلَّةِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়াজ জিল্লাতি, ওয়া আউজুবিকা মিন আন আজলিমা আও উজলামা।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য, স্বল্পতা ও অপমান থেকে আশ্রয় চাই। একই সঙ্গে আপনার কাছে আশ্রয় চাই, যেন আমি কাউকে অত্যাচার না করি এবং কেউ আমার ওপর অত্যাচার করতে না পারে।

(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৫৪৪)

দোয়াটির মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর কাছে আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক অপমান ও অন্যায়ের শিকার হওয়া থেকেও নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন।

৩. উত্তম রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন

পবিত্র কোরআনে হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীদের একটি বিশেষ প্রার্থনার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাঁরা আল্লাহর কাছে আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ দস্তরখান অবতীর্ণ করার আবেদন করেছিলেন। সেই দোয়ায় আল্লাহর কাছে রিজিক চাওয়ার কথাও রয়েছে।

দোয়াটি হলো—

اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِنْكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামায়ি, তাকুনু লানা ঈদাল লি-আউয়ালিনা ওয়া আখিরিনা ওয়া আয়াতাম মিনকা। ওয়ারযুকনা ওয়া আনতা খাইরুর রাজিকিন।

অর্থ: হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ একটি দস্তরখান অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের রিজিক দান করুন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।

(সুরা আল-মায়িদা, আয়াত ১১৪)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে রিজিক প্রার্থনার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এটি মূলত হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীদের বিশেষ প্রার্থনা হিসেবে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।

৪. নিয়মিত ইস্তিগফার ও তওবা করুন

ইসলামে ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কোরআনে হজরত নূহ (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর জাতিকে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, বৃষ্টি, সম্পদ ও নেয়ামত লাভের কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۝ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ۝ وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا

অর্থ: ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন ও নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নূহ, আয়াত ১০-১২)

ইস্তিগফারের একটি সহজ আমল হলো—

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।

অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই তওবা করছি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও প্রতিদিন নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন—

إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ

অর্থ: ‘আমি প্রতিদিন একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তওবা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭০২)

এ ছাড়া ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ তৈরি করেন, সংকট থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৫১৮)

তাই প্রতিদিনের আমলের অংশ হিসেবে ইস্তিগফার করা এবং নিজের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

৫. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন এবং চেষ্টা চালিয়ে যান

রিজিকের ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাওয়াক্কুলের অর্থ কাজকর্ম ছেড়ে বসে থাকা নয়। বরং বৈধ উপায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ

অর্থ: ‘তোমরা যদি যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দান করতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দান করেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ২৩৪৪)

পাখিরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে। এই হাদিসে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি জীবিকা অর্জনের জন্য বের হওয়ার শিক্ষাও রয়েছে। অর্থাৎ, চেষ্টা ও পরিশ্রমের সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।

৬. হালাল রিজিক ও অন্যের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্তির দোয়া

ঋণ, আর্থিক সংকট কিংবা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত একটি সুন্দর দোয়া রয়েছে।

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত রাখুন।

(জামে তিরমিজি, হাদিস ৩৫৬৩)

এই দোয়ায় হালাল উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত থাকার প্রার্থনা করা হয়েছে।

অভাবের সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি

অভাব-অনটন মানুষের জীবনের একটি কঠিন পরীক্ষা হতে পারে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে হতাশ হয়ে পড়া কিংবা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, বেশি বেশি ইস্তিগফার, দোয়া ও তওবার পাশাপাশি হালাল উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

মনে রাখতে হবে, রিজিক মানেই শুধু অর্থ-সম্পদ নয়। সুস্থ শরীর, পরিবারের ভালোবাসা, মানসিক প্রশান্তি, অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা এবং উপার্জনে বরকতও আল্লাহর দেওয়া বড় নেয়ামত।

আসুন, আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের অভাব-অনটন দূর করেন, ঋণমুক্ত জীবন দান করেন, হালাল রিজিকে বরকত দেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করেন।

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

Advertisements