২ নভেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

মা–বাবার বিষণ্নতা যেভাবে সন্তানের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে

divorce_3_20260708_134513560

পরিবার একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মা–বাবার কাছ থেকেই শিশু ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সহমর্মিতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার শিক্ষা পায়। কিন্তু মা–বাবার কেউ বিষণ্নতায় ভুগলে তার প্রভাব শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে সন্তানের মানসিক ও শারীরিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা পারিবারিক পরিবেশকে বদলে দিতে পারে, যা শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথে নানা বাধা সৃষ্টি করে।

বিষণ্নতার প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর

বিষণ্নতা কেবল মন খারাপ থাকার নাম নয়। এটি এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা, যার কারণে একজন মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে হতাশা, আগ্রহহীনতা, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা এবং দৈনন্দিন কাজে অনীহায় ভুগতে পারেন। ফলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত মা–বাবার পক্ষে সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটানো, তার অনুভূতি বোঝা কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ছবি:সংগৃহীত

একটি শিশু যখন বারবার মা–বাবার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও আবেগীয় সমর্থন পায় না, তখন তার মধ্যে একাকিত্ব, অনিরাপত্তা ও অবহেলিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু ভাবতে শুরু করে, মা–বাবার মন খারাপের জন্য হয়তো সে নিজেই দায়ী। এই ভুল ধারণা তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আচরণ ও পড়াশোনায় পরিবর্তন

মা–বাবার বিষণ্নতার প্রভাব সন্তানের আচরণেও প্রকাশ পেতে পারে। কোনো শিশু অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যেতে পারে, আবার কেউ কেউ অল্পতেই রেগে যাওয়া, জেদ করা কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা নিজেদের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে না পারায় আচরণের মাধ্যমে মানসিক কষ্ট প্রকাশ করে।

Advertisements
ছবি:সংগৃহীত

এ ছাড়া পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, স্কুলে যেতে অনীহা, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে না চাওয়া এবং ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিশুর সামাজিক দক্ষতা ও শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সন্তানের মধ্যেও তৈরি হতে পারে বিষণ্নতা

গবেষণায় দেখা গেছে, মা–বাবার বিষণ্নতা সন্তানের ভবিষ্যৎ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। এর পেছনে বংশগত প্রবণতা, পারিবারিক পরিবেশ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ—সবই ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মা–বাবা বিষণ্নতায় ভুগলেই সন্তান বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবে, এমন নয়।

শিশু যদি দীর্ঘদিন অস্থির, চাপপূর্ণ বা আবেগীয়ভাবে অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তাহলে তার মধ্যে উদ্বেগ, ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিশোর বয়সে এসব সমস্যা আরও জটিল রূপ নিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি করার চিন্তাও দেখা দিতে পারে, যা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।

দায়িত্বের বোঝা শিশুর কাঁধে

পরিবারে মা–বাবার কেউ বিষণ্নতায় ভুগলে অনেক সময় বড় সন্তানকে ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা, ঘরের কাজ কিংবা পরিবারের নানা দায়িত্ব নিতে হয়। বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে শিশুর নিজের শৈশব, পড়াশোনা ও সামাজিক জীবন ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে মা–বাবাকে নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা তার মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে।

সমাধানে প্রয়োজন সচেতনতা ও পারিবারিক সহযোগিতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, মা–বাবার বিষণ্নতা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে সন্তানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ জন্য প্রথমেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় থেরাপি এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে বিষণ্নতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং তাকে বোঝানো জরুরি যে মা–বাবার মানসিক সমস্যার জন্য সে কোনোভাবেই দায়ী নয়। প্রয়োজনে স্কুলের শিক্ষক, পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্য কিংবা শিশু মনোবিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

শিশুর আচরণে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভয়, হতাশা, নিজেকে গুটিয়ে রাখা কিংবা নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আত্মহানির তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকলে শিশুকে একা না রেখে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।

মা–বাবার মানসিক সুস্থতা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়া কোনো অপরাধ বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা। তাই আক্রান্ত মা–বাবাকে দোষারোপ না করে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং একই সঙ্গে সন্তানের মানসিক চাহিদার প্রতি যত্নশীল হওয়া জরুরি। কারণ একটি সুস্থ পরিবার গড়ে ওঠে শুধু শারীরিক যত্নে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার মধ্য দিয়ে।

Advertisements