জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও কেন অভিনয় ছেড়েছিলেন শাবানা?

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম শাবানা। শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু, এরপর নায়িকা হয়ে দীর্ঘ তিন দশক ধরে দর্শকদের উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা। অভিনয়দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব ও পর্দায় সাবলীল উপস্থিতি দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়ে। অথচ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ অভিনয়জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘদিনের পরিচিত কর্মজগৎ, সহশিল্পী ও ভক্তদের ছেড়ে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল এক বিশেষ কারণ—সন্তানদের ভবিষ্যৎ।

শাবানার প্রকৃত নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র আট বছর বয়সে। ষাটের দশকের শুরুতে এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত উর্দু সিনেমা ‘চকোরী’তে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
লাজুক মেয়েটিই হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ
শৈশবে বেশ লাজুক ছিলেন শাবানা। প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর তাঁর বাবা ফয়েজ চৌধুরীও শুরুতে রাজি ছিলেন না। তবে পরিচালক এহতেশামের আগ্রহে শেষ পর্যন্ত মেয়েকে অভিনয়ের অনুমতি দেন।

শাবানার স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ‘নতুন সুর’ ছবিতে তাঁর প্রথম দৃশ্য ছিল আনন্দের সংবাদ নিয়ে দৌড়ে এসে ভাইকে বলা—‘ভাইয়া, ভাইয়া, আপুর বিয়ে।’ প্রথমবারেই দৃশ্যটি ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। এরপর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর।
মজার বিষয় হলো, শুরুতে মেয়ের অভিনয়ে আপত্তি থাকলেও পরবর্তী সময়ে বাবা হয়ে ওঠেন তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাদাতাদের একজন। ফয়েজ চৌধুরী নিজেও কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তি’, ‘মালকাবানু’, ‘বিজয়িনী সোনাভান’, ‘আলতাবানু’ ও ‘রাজার মেয়ে বেদিনী’।
তিন দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য সাফল্য
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে শাবানা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল অভিনেত্রী হিসেবে। নায়িকা থেকে শুরু করে ভাবি, মা—বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে দেখিয়েছেন বহুমাত্রিক দক্ষতা। প্রায় ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে আলমগীরের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই অভিনেতার বিপরীতে প্রায় ১৩০টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাবানা। নায়করাজ রাজ্জাকের সঙ্গেও তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা রয়েছে।
অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে দেওয়া হয়েছে আজীবন সম্মাননাও। সব মিলিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অধ্যায়।
সন্তানদের জন্যই ছেড়েছিলেন রুপালি পর্দা
ক্যারিয়ারের এমন সাফল্যের সময় অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। তবে শাবানার কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সন্তানদের ভবিষ্যৎ। তাঁর বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পরে ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে চলে যান।
সন্তানদের থেকে দূরে থেকে তাঁদের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময় হারাতে চাননি এই অভিনেত্রী। কাজের ব্যস্ততায় সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। একপর্যায়ে অভিনয়জীবনের চেয়ে মাতৃত্বের দায়িত্বকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
এ বিষয়ে শাবানা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘লাখো-কোটি মানুষের ভালোবাসায় শাবানা হলাম। হঠাৎ মনে হলো, সন্তানদেরও তো সময় দেওয়া দরকার।’ তিনি জানান, সন্তানরা তাঁকে খুব মিস করছিল। দেশে থাকাকালে কাজের ফাঁকে তাঁদের দেখতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর দূরত্ব বেড়ে যায়। তাই মা হিসেবে সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালনে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আলো ঝলমলে জগৎ ছেড়ে অন্য জীবনে
চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা, জনপ্রিয়তা ও দর্শকের ভালোবাসা—সবকিছু পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান শাবানা। সেখানে সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গঠনে মনোযোগী হন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনেক ভক্তের জন্য ছিল বিস্ময়কর। কারণ, যে সময়ে তিনি অভিনয় করছিলেন, তখনো দর্শকদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

তবে শাবানার কাছে জীবনের সাফল্য শুধু চলচ্চিত্রের অর্জনে সীমাবদ্ধ ছিল না। সন্তানদের পাশে থাকা এবং তাঁদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও ছিল তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই রুপালি পর্দার আলো ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন মাতৃত্বের দায়িত্ব। দর্শকদের মনে আজও তাঁর অভিনয়ের স্মৃতি অমলিন; আর অভিনয় ছাড়ার পেছনের গল্পটি মনে করিয়ে দেয়, একজন তারকার জীবনেও পরিবারের গুরুত্ব কতটা গভীর।



