সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন: বিষণ্ণতার নতুন ধরন

রাতে দেরি করে ঘুমানো, সকালে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েও ক্লান্তি না কমা; বিষণ্ণতায় আক্রান্ত অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়। এত দিন এসবকে বিষণ্ণতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের এই সমস্যাগুলোই বিষণ্ণতার কারণ হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা বিষণ্ণতার সম্ভাব্য একটি নতুন ধরন চিহ্নিত করেছেন। এর নাম দিয়েছেন ‘সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশন’। তাদের ধারণা, শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জেগে থাকার সময় এলোমেলো হয়ে গেলে কিছু মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে।
দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে এক গবেষণায় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পরীক্ষা করে ছয় ধরনের পার্থক্য খুঁজে পেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে নতুন গবেষণায় মস্তিষ্কের বদলে ঘুমের অভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘুমের সময় এলোমেলো হলে কী হয়
আমাদের শরীর একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। কখন ঘুম আসবে, কখন ঘুম ভাঙবে, কখন শরীর বেশি সতেজ থাকবে; এসব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ। একে বলা হয় শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি। দিনের আলো এই ঘড়িকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
কিন্তু এই নিয়মে গরমিল হলে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কেউ রাতে সহজে ঘুমাতে পারেন না। কেউ আবার অনেকক্ষণ ঘুমিয়েও ক্লান্ত থাকেন। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষের মধ্যে এমন সমস্যা প্রায়ই দেখা যায়।
গবেষকেরা এমন ছয়টি লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো একসঙ্গে থাকলে শরীরের ঘুম-জেগে ওঠার স্বাভাবিক নিয়মে সমস্যা থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। লক্ষণগুলো হলো—ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মেজাজের পরিবর্তন হওয়া; রাতে দেরি করে ঘুমানো; রাত জাগতে বেশি ভালো লাগা; স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানো; ঘুম থেকে ওঠার পরও খুব ক্লান্ত থাকা; কর্মদিবস ও ছুটির দিনে ঘুমানোর সময়ের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকা।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণায় ১১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গেছে, তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের মধ্যে এই ছয়টি লক্ষণের অন্তত তিনটি আছে। তাদের বিষণ্ণতা অন্যদের তুলনায় কম বয়সে শুরু হয়েছে এবং এর তীব্রতাও বেশি ছিল।
এ ছাড়া তাদের মধ্যে এডিএইচডি, বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও ইনসুলিন প্রতিরোধের জিনগত ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব সিডনির গবেষক এমিলিয়ানা তোনিনির ধারণা, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের ঘুম-জাগার নিয়মে সমস্যা থেকেই বিষণ্ণতা শুরু হতে পারে।
গবেষণার আরেক লেখক জ্যাকব ক্রাউস বলেন, বিষণ্ণতা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে দেখা দেয় না। এর কারণও একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তাই একই চিকিৎসা সবার ক্ষেত্রে কাজ করে না। গবেষণাটি প্রকাশের পর অনেকে তাকে জানিয়েছেন, তাদের ঘুমের অভ্যাস ও বিষণ্ণতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে গবেষণার বর্ণনা মিলে গেছে।
ঘুমের সময় বদলালে কি বিষণ্ণতা কমবে
গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মধ্যে এই বিশেষ লক্ষণগুলো রয়েছে, তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, বিষণ্ণতার ওষুধ তাদের ক্ষেত্রে কম কাজ করে। তবে এর কারণ শরীরের ঘুম-জাগার নিয়মে সমস্যা কি না, তা নিশ্চিত নয়। তাদের বিষণ্ণতা অন্য কারণেও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলিন ম্যাকক্লাং মনে করেন, তাদের মধ্যে কিছু মানুষের বিষণ্ণতা না হয়ে বাইপোলার ডিসঅর্ডারও থাকতে পারে।
এখানে একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, ঘুমের সমস্যা কি বিষণ্ণতা তৈরি করছে, নাকি বিষণ্ণতার কারণেই ঘুমের সমস্যা হচ্ছে?
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বাভাবিকভাবেই রাতে দেরিতে ঘুমাতে যান, তাদের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। আবার বিষণ্ণতার কারণেও ঘুমের সময় এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যারা রাতে দেরিতে ঘুমান, তাদের ঘুমানোর সময় কিছুটা এগিয়ে আনলে মেজাজ ভালো হয়। তবে বিশেষজ্ঞ ডেভিড কার্টিসের মতে, বিষণ্ণতা কমার কারণেও ঘুমের স্বাভাবিক নিয়ম ফিরতে পারে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুমের স্বাভাবিক নিয়ম ঠিক রাখতে কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে আসতে পারে। এর একটি হলো উজ্জ্বল আলো দিয়ে চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ে উজ্জ্বল আলোর সামনে থাকতে হয়।
২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ৮০০ জনের বেশি মানুষ আলো দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তাদের ৪০ শতাংশের বেশি সুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছান। অন্যদিকে, যারা এই চিকিৎসা পাননি, তাদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২৫ শতাংশ।
তবে এসব পরীক্ষায় সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের লক্ষণ থাকা ব্যক্তিদের আলাদা করে বাছাই করা হয়নি।
মেলাটোনিনের ক্ষেত্রেও তেমন আশাব্যঞ্জক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিষণ্ণতা কমাতে মেলাটোনিনের স্পষ্ট উপকার নেই।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির গবেষকেরা এখন তরুণদের ওপর মেলাটোনিনের প্রভাব পরীক্ষা করতে চান। বিশেষ করে যাদের ঘুমের অভ্যাস ও দৈনন্দিন সময়ের সঙ্গে সার্কাডিয়ান ডিপ্রেশনের লক্ষণ মেলে।



