এল নিনোর প্রভাবে বলিভিয়ায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা

প্রচণ্ড খরা ও সম্ভাব্য ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার (৩১ অক্টোবর) বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ জরুরি অবস্থা ঘোষণাসংক্রান্ত একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। একই সঙ্গে বন্যা ও খরায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের অতিরিক্ত সদস্য পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ সতর্ক করে বলেন, এল নিনোর প্রভাবে খরা ও বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের সব সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বলিভিয়া সরকারের চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশটির খরা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির ৯টি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে ৬টিতে খরার প্রভাব পড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৭৮ হাজার পরিবার। দীর্ঘস্থায়ী পানির সংকট ও খরার কারণে দেশটিতে ৭৫ হাজারেরও বেশি গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে কৃষি ও পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
শুধু খরা নয়, বলিভিয়ায় বন্যার আশঙ্কাও বাড়ছে। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশটির সান্তা ক্রুজ অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এদিকে প্রতিবেশী দেশ চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে গত অক্টোবর মাসে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে, গত মাসে পেরুতে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনেও পরিবর্তন আসে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া।
এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে এর তীব্রতা এবং ক্ষয়ক্ষতির ধরন পরিবর্তিত হয়। তবে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এবারের এল নিনো অতীতের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি ২০২৭ সালজুড়েও এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সীমিত সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। এসব অঞ্চলে খাদ্যসংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছিল, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।



