এক শ্রীলঙ্কান নারীর দুঃসহ দ্বীপবাস

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে ছোট্ট কোনো দ্বীপে আটকে পড়াটা কারো কাছে স্বপ্ন, কারো জন্য রোমাঞ্চকর; তবে ৫০ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান নারী রুচিরা রানাসিংঘার জন্য তা হয়ে উঠে দুঃসহ এক বন্দীজীবন। নানান আইনী জটিলতায় তিন বছর ধরে তিনি আটকে আছেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট্ট দ্বীপ কুক আইল্যান্ডসে।
সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে তার দুঃসহ জীবনের বিবরণ তুলে ধরা হয়। ২০১৮ সালে ভাগ্য বদলানোর আশায় দেশ ছেড়েছিলেন রুচিরা। হংকং হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ড। সেখানেই থিতু হওয়ার ইচ্ছা ছিল।
কিন্তু এক অভিবাসন উপদেষ্টার পরামর্শে সাময়িকভাবে কুক আইলান্ডসে যান তিনি। তারপর থেকে সেখানেই আটকে আছেন রুচিরা। এখন তিনি যে কোনো মূল্যে দেশে ফিরতে চান; প্রয়োজনে হাতে হাতকড়া, মুখ ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হলেও। কিন্তু নিউজিল্যান্ড তাকে ট্রানজিট ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়াও তাকে ট্রানজিট ভিসা দিতে রাজি নয়।
কুক আইল্যান্ডস থেকে তিনি আর যে দুটি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড়ে যেতে পারতেন তা হলো তাহিতি এবং হাওয়াই। কিন্তু সেখানে যেকোনো ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া করার আগে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে সশরীরে বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই তার কুক আইল্যান্ডস ছাড়ার আর কোনো বাস্তবসম্মত পথ খোলা নেই।
চোখের পানি মুছতে মুছতে রুচিরা বলেন, ‘নভেম্বর মাসে আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে হতে যাচ্ছে এবং আমি সত্যিই তার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে চাই। আমার কী হয়েছে তা নিয়ে আমার মা এতটাই দুশ্চিন্তা করছেন যে তাকে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে যাওয়া-আসা করতে হচ্ছে। তারা আমাকে যা করতে বলবে আমি তা-ই করব—আমি শুধু বাড়ি ফিরতে চাই।’
ব্যবসায় লোকসানের কারণে নিজের ছোট টি-শার্ট কারখানাটি বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার পর ২০১৮ সালে রানাসিংঘা শ্রীলঙ্কা ত্যাগ করেন। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খেয়ে তিনি বয়স্ক ও শিশুদের গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য হংকং চলে যান।
তার ভাই বিবিসিকে জানান যে তিনি প্রচণ্ড আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছিলেন। তিনি আরো যোগ করেন, তার স্বামী একজন মাদকাসক্ত ছিলেন এবং প্রায় সাত বছর আগে মারা যান।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে রুচিরা নিউজিল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি দুই মাসের ভিজিট ভিসায় তার এক কাজিনের সঙ্গে থাকতেন বলে জানান। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসার মুখে, একজন ইমিগ্রেশন দোভাষী তাকে শ্রীলঙ্কার ঋণদাতাদের কাছ থেকে হুমকির মুখোমুখি হওয়ার অজুহাতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে সাহায্য করেন। তাকে একজন আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ‘ওপেন ওয়ার্ক ভিসা’ দেওয়া হয়, যার ফলে তিনি এক বছরের জন্য যেকোনো নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। তিনি একটি রেস্তোরাঁয় চাকরি পান এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ তাকে একটি এমপ্লয়মেন্ট ভিসা স্পন্সর করতে রাজি হয়, যা তাকে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব দেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।
কিন্তু নিউজিল্যান্ডে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকাকালীন সাধারণত তারা অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন না বলে সেটি বাতিল করে দেওয়া হয়। তখনই তিনি ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সেক্রেটারিয়াল সার্ভিসেস’ নামের একটি ফার্মের সাথে যোগাযোগ করেন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি তাকে বলেছিল যে বিদেশ থেকে এমপ্লয়মেন্ট ভিসার জন্য নতুন করে আবেদন করা যেতে পারে।
ওই ফার্মের ম্যানেজার সিলভিয়ান গ্যালান্ট বলেছিলেন যে রুচিরা দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই প্রক্রিয়া শুরু করবেন। তাই আবেদন করার সময়টুকুর জন্য তিনি কুক আইল্যান্ডসে একটি সংক্ষিপ্ত অবস্থানের জন্য টিকিট বুক করেন। সে সিদ্ধান্তই রুচিরার জন্য কাল হয়েছে। তাকে নতুন করে এমপ্লয়মেন্ট ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। আর নিউজিল্যান্ড ছাড়ার কারণে তিনি তার বিদ্যমান ভিসার শর্তাবলী লঙ্ঘন করেন। নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে ভবিষ্যতে তাকে আর কোনো ভিসা দেওয়া হবে না।
গ্যালান্ট তার পক্ষ হয়ে বিভিন্ন তদবির করার দাবি করেন, যার মধ্যে নিউজিল্যান্ডের তৎকালীন ইমিগ্রেশন মন্ত্রী ক্রিস পেনকসহ অন্য রাজনীতিকদের কাছে চিঠি লেখাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রানাসিংঘা বলেন, গ্যালান্ট স্বীকার করেন যে পরিস্থিতিটি তার ভুলের কারণেই হয়েছে এবং তাকে বলেন যে তার আর কিছুই করার নেই।’
এরপর রুচিরা যখন শ্রীলঙ্কার টিকিট নিয়ে এয়ার নিউজিল্যান্ডের বিমানে চড়ার জন্য বিমানবন্দরে হাজির হন, তখন তাকে বলা হয় যে নিউজিল্যান্ডের ট্রানজিট ভিসা ছাড়া তিনি বিমানে উঠতে পারবেন না। নিউজিল্যান্ডের ট্রানজিট ভিসার জন্য তার তিনটি আবেদনই প্রত্যাখ্যান করা হয়।
কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি যে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে আবার সেটি ত্যাগ করবেন, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না। অস্ট্রেলিয়ার ট্রানজিট ভিসার জন্য করা চারটি আবেদনও একইভাবে বাতিল করা হয়।
একটি প্রত্যাখ্যানপত্রে নিউজিল্যান্ড তাকে বিকল্প রুট খুঁজে দেখার পরামর্শ দেয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হাওয়াই এবং ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার দ্বীপ তাহিতি—উভয় পক্ষই তাকে জানায় যে কোনো ভিসা প্রক্রিয়া করার আগে তাকে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হবে, যা কেবল নিউজিল্যান্ডে সশরীরে গিয়েই দেওয়া সম্ভব।
নিউজিল্যান্ডে করা তার সর্বশেষ আবেদনটি—যেটিতে তিনি যেসব বিকল্প রুটের চেষ্টা করছিলেন তার সমস্ত বিবরণ, সেই সাথে তার ছেলের আসন্ন বিয়ে এবং মায়ের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছিলেন—তাও প্রত্যাখ্যান করা হয়।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রুচিরা বলেন, ‘টিকিটের পেছনে আমি অনেক টাকা হারিয়েছি। প্রায় চার বছর ধরে আমি কেবল একটার পর একটা ভিসার আবেদনই করে যাচ্ছি, কিন্তু কোনো কিছুই কাজে আসছে না।’
অকল্যান্ড থেকে মাত্র চার ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত দিগন্ত বিস্তৃত বালুকাময় সমুদ্রসৈকত এবং রুক্ষ আগ্নেয়গিরির চূড়ার জন্য পরিচিত এই দ্বীপপুঞ্জে রুচিরা এখন একজন অনিচ্ছাকৃত অতিথি। তিনি অবশ্য বলেন যে তার মতো পরিস্থিতিতে থাকা অন্যদের তুলনায় তিনি কিছুটা ভাগ্যবান। কারণ হোটেল কর্তৃপক্ষ তাকে তাদের স্টাফ কোয়ার্টারে বিনামূল্যে থাকার অনুমতি দিয়েছে এবং স্থানীয় বন্ধুত্বপূর্ণ বাসিন্দারা তাকে খাবার ও পোশাক জুগিয়ে যাচ্ছেন।
হোটেলের একজন পরিচালক তাকে একটি সেলাই মেশিনও উপহার দিয়েছেন, যা দিয়ে তিনি সামান্য কিছু আয় করতে পারছেন। তিনি বিবিসি-কে বলেন, ‘আমার মা সবসময় আমাকে বলেন যে আমি নিশ্চয়ই ভালো কোনো কাজ করেছিলাম, যার কারণে আমি এমন একটি জায়গায় এসেছি যেখানে মানুষ আমার প্রতি এত দয়ালু।’ কিন্তু এই দয়াও তার খাঁচায় বন্দি থাকার অনুভূতিকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারছে না।
অকল্যান্ড-ভিত্তিক অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ অ্যালিস্টার ম্যাকক্লিমন্ট বলেন, ‘সত্যি বলতে, তার সমাধান কী তা আমার জানা নেই।’
তিনি বলেন, ওই নারী ভয়ানক ভুল পরামর্শ পেয়েছিলেন, যা নিশ্চিতভাবেই কোনো আসল অভিবাসন আইনজীবীর কাছ থেকে আসতে পারে না। তিনি তথাকথিত অভিবাসন পরামর্শদাতাদের একটি চক্রের দিকে ইঙ্গিত করেন, যারা কোনো ঝুঁকি না বুঝেই আবেদনের জন্য মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। রুচিরা জানান, তিনি ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সেক্রেটারিয়াল সার্ভিসেস’-কে ফি বাবদ হাজার হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার দিয়েছেন।
ম্যাকক্লিমন্ট ইঙ্গিত দেন যে নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ তাকে ট্রানজিট ভিসা দেবে না, কারণ তাদের ধারণা, যেহেতু এই নারী আগে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে দাবি করেছিলেন যে শ্রীলঙ্কায় তার জীবন বিপন্ন, তাই তিনি আর শ্রীলঙ্কায় ফিরতে চান না। তিনি আরও বলেন, নিউজিল্যান্ড তাদের প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়ার সাথে সমন্বয় করে কাজ করে, যার অর্থ অস্ট্রেলিয়াও তাকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে চাইবে না এবং ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সম্ভবত একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। দেশ ছাড়তে হলে তাকে কোনো না কোনো জায়গা দিয়ে ট্রানজিট নিতেই হবে এবং কেউই এই ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
ইমিগ্রেশন নিউজিল্যান্ড বিবিসি-কে জানিয়েছে যে তারা রুচিরার কাছ থেকে একাধিক ট্রানজিট ভিসার আবেদন পেয়েছেন এবং সবগুলোই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে ‘কারণ আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি যে নিউজিল্যান্ডের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নেওয়ার বিষয়ে তার কোনো আসল উদ্দেশ্য রয়েছে।
রুচিরা হাতকড়া পরা এবং প্রহরী বেষ্টিত অবস্থায় যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও কেন তাকে একটি ভিসা দেওয়া যাচ্ছে না; জানতে চাইলে ইমিগ্রেশন মন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি জানান, এই ব্যবস্থাগুলো কোনো ব্যক্তিকে পুনরায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করা থেকে বিরত রাখতে পারে না।
এদিকে, শ্রীলঙ্কা সরকার কোনো সাহায্য করতে পারে কি না তা দেখার চেষ্টা করছে রুচিরার পরিবার। তার ভাই বলেন, তারা সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা এই বিষয়ে কোনো সমাধান বের করতে পারিনি।’
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসি-কে জানিয়েছে যে তারা কুক আইল্যান্ডস থেকে শ্রীলঙ্কায় তার প্রত্যাবর্তন সহজতর করার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে অবস্থিত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনের কর্মকর্তারা এবং নিউজিল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
কিন্তু রুচিরার ভাই গভীরভাবে চিন্তিত। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘তার মানসিক অবস্থা ভালো নয়। আমাদের একবার কথা বলার সময় সে আমাকে বলেছিল, তারা যদি তাকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে রাজি না হয়, তবে তারা যেন অন্তত তার মৃতদেহটি দেশে ফেরত পাঠায়।’
সূত্র : বিবিসি



