৩০ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
ধর্ম

পবিত্র কোরআন হিফজের গুরুত্ব ও অসাধারণ ফজিলত

image_70101_1709375179

পবিত্র কোরআন হিফজ বা মুখস্থ করা ইসলামের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, পুরো কোরআন হিফজ করা ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ মুসলিম সমাজের একটি অংশ এ দায়িত্ব পালন করলে অন্যরা দায়মুক্ত থাকবেন। তবে কোরআনের হিফজ শুধু একটি ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, বরং এর মাধ্যমে অর্জিত হয় অসংখ্য সওয়াব ও পরকালীন মর্যাদা।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও পবিত্র কোরআন মুখস্থ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা হিফজ করার প্রতি উৎসাহিত করতেন। কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুল (সা.) তাকে প্রথমে কোরআন শিক্ষা দিতেন। পরবর্তী সময়ে নতুন মুসলিমরা নিজেরা কোরআন শিখতেন এবং অন্যদেরও শেখাতেন ও মুখস্থ করাতেন। এভাবেই সাহাবিদের মধ্যে অনেকেই হাফেজে কোরআন হিসেবে গড়ে ওঠেন।

ইসলামের ইতিহাসে কোরআন হিফজের গুরুত্বের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, একটি যুদ্ধে ৭০ জন কোরআনের হাফেজ শহীদ হন। এ ঘটনায় হজরত ওমর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কাছে কোরআনকে একত্রে গ্রন্থাকারে সংকলন ও সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন। তার আশঙ্কা ছিল, এভাবে হাফেজরা শহীদ হতে থাকলে একসময় কোরআনের সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে সাহাবিদের উদ্যোগে কোরআন গ্রন্থাকারে সংকলনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে মুখস্থের মাধ্যমে কোরআন সংরক্ষণের ধারাও অব্যাহত থাকে।

কোরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হিফজ করা

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এর পাঠ, মুখস্থ ও সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি তোমাকে পড়িয়ে দেব, অতঃপর তুমি ভুলবে না।’ (সুরা আলা, আয়াত : ৬)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কোরআন পাঠ ও তা স্মরণে রাখার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.)-এর অন্তরে কোরআন সংরক্ষিত রাখার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছিলেন।

Advertisements

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কাফিররা বলে, তার কাছে পুরো কোরআন একসঙ্গে অবতীর্ণ করা হলো না কেন? আমি এভাবেই অবতীর্ণ করেছি, তোমার হৃদয়কে তা দ্বারা সুদৃঢ় করার জন্য এবং তোমার কাছে তা ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে আবৃত্তি করেছি।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৩২)

এ আয়াতের মাধ্যমে কোরআন ধাপে ধাপে নাজিল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হয়েছে। তা হলো, রাসুল (সা.) যেন সহজে কোরআনের আয়াতগুলো আয়ত্ত করতে পারেন, স্মরণ রাখতে পারেন এবং মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারেন।

সুরা কিয়ামাহর ১৭-১৯ নম্বর আয়াতেও কোরআন সংরক্ষণ, পাঠ করানো এবং এর ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি তা পাঠ করি, তখন তুমি সেই পাঠের অনুসরণ করো। এরপর এর ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও আমার।’

কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর

পবিত্র কোরআন সর্বশেষ আসমানি কিতাব। এটি কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে থাকবে। তাই মহান আল্লাহ নিজেই কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমিই এ উপদেশ (কোরআন) নাজিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৯)

কোরআন সংরক্ষণের অর্থ শুধু এর লিখিত কপি অক্ষত রাখা নয়; বরং এর শব্দ, উচ্চারণ ও অর্থের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত। যুগে যুগে অসংখ্য হাফেজের মাধ্যমে কোরআনের আয়াতগুলো মুখস্থ ও চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিরবচ্ছিন্নভাবে এ ধারাটি চলে আসছে।

কোরআনের লিখিত সংরক্ষণের পাশাপাশি হিফজের মাধ্যমে সংরক্ষণও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ হাফেজ নিজেদের স্মৃতিতে কোরআনের আয়াত ধারণ করে রেখেছেন। ফলে লিখিত কপির পাশাপাশি মানুষের হৃদয়েও কোরআন সংরক্ষিত রয়েছে।

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) কোরআনের সংরক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এর বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। তাফসিরে কাবিরে (খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২৬৫) তিনি কোরআনের সংরক্ষণের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

আলেমদের মতে, কোরআন সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান দুটি মাধ্যম হলো লিখিত সংকলন এবং মুখস্থ বা হিফজ। কোরআনের হিফজের মর্যাদা শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরকাল ও জান্নাতেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ বিষয়ে হাদিসে একাধিক সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।

কোরআন হিফজকারীর বিশেষ মর্যাদা

পবিত্র কোরআন মুখস্থ করা এবং শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করার মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বিভিন্ন হাদিসে সুসংবাদ দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পাঠে দক্ষ, সে সম্মানিত ও পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোরআন পাঠের সময় আটকে যায় এবং কষ্ট করে তা পাঠ করে, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ প্রতিদান।’ (সহিহ বুখারি)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, যারা শুদ্ধভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত করেন, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। একই সঙ্গে যারা কষ্ট করে কোরআন শেখেন এবং পড়ার চেষ্টা করেন, তারাও আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করবেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র কোরআন পাঠ করেছে, সে নবুওয়াতের জ্ঞান (কোরআন) নিজের দুই পাঁজরের মধ্যবর্তী স্থানে (অন্তরে) ধারণ করেছে; যদিও তার কাছে ওহি নাজিল করা হয় না। আর কোরআনের ধারক ব্যক্তির জন্য সমীচীন নয় যে, সে রাগান্বিত ব্যক্তির সঙ্গে রাগ করবে কিংবা অজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে অজ্ঞতাসুলভ আচরণ করবে। কারণ, তার অন্তরে আল্লাহ তায়ালার বাণী সংরক্ষিত রয়েছে।’ (শুআবুল ঈমান-মুসতাদরাকে হাকেম)

এই হাদিসে কোরআনের ধারক ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্বের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোরআন মুখস্থ করার পাশাপাশি এর শিক্ষা নিজের চরিত্র ও আচরণে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। একজন হাফেজের আচরণে ধৈর্য, বিনয়, সহনশীলতা ও উত্তম নৈতিকতার প্রতিফলন থাকা উচিত।

কিয়ামতের দিন কোরআন সুপারিশ করবে

কোরআন হিফজকারীদের জন্য পরকালেও রয়েছে বিশেষ সম্মান ও পুরস্কারের ঘোষণা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন পবিত্র কোরআন উপস্থিত হবে এবং সুপারিশ করে বলবে, হে আমার রব! এই হাফেজকে সম্মানের পোশাক পরিয়ে দিন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মানের মুকুট পরাবেন। এরপর কোরআন বলবে, হে আমার রব! তাকে আরও সম্মানিত করুন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মানের পোশাক পরিয়ে দেবেন। এরপর কোরআন বলবে, হে আমার রব! তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, পড়তে থাকো এবং জান্নাতের মর্যাদায় উন্নীত হতে থাকো। প্রতিটি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে নেকি বৃদ্ধি করা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি)

এ হাদিস থেকে কোরআনের হাফেজদের জন্য কিয়ামতের দিনের বিশেষ সম্মান ও জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির সুসংবাদ পাওয়া যায়। কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নিয়মিত তা তিলাওয়াত করার গুরুত্বও এতে স্পষ্ট হয়েছে।

কোরআনের ধারকদের মর্যাদা ও সম্মান

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পবিত্র কোরআন সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি কোরআনের সম্মান করে, সে আল্লাহ তায়ালার সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি কোরআনের অবমূল্যায়ন ও অবমাননা করে, সে আল্লাহ তায়ালার অধিকারের অবমূল্যায়ন করে। কোরআনের ধারক-বাহক (হাফেজ ও আলেমরা) আল্লাহর রহমতের আওতাভুক্ত। তারা আল্লাহর বাণীর মর্যাদা ও সম্মান রক্ষাকারী। তারা আল্লাহর নূরে আবৃত। যারা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখে, তারা আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখে। আর যারা তাদের সঙ্গে শত্রুতা করে, নিশ্চয়ই তারা আল্লাহর অধিকারের অবমূল্যায়ন করে।’ (আল-জামি লি আহকামিল কোরআন, ইমাম কুরতুবি)

এই বর্ণনায় কোরআনের মর্যাদা রক্ষা এবং এর ধারক-বাহকদের সম্মান করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তবে কোরআনের প্রকৃত সম্মান তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন এর শিক্ষা অনুযায়ী ব্যক্তি নিজের জীবন পরিচালনা করে।

জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম কোরআন

কোরআন হিফজকারীদের জন্য জান্নাতেও রয়েছে বিশেষ মর্যাদার সুসংবাদ। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জান্নাতের মর্যাদার স্তরসংখ্যা কোরআনের আয়াতসংখ্যার সমান। সুতরাং কোরআনের হাফেজদের মধ্যে যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করে এবং সম্পূর্ণ কোরআন পাঠ করে, তার ওপরে আর কেউ থাকবে না।’ (ইমাম বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)

এ হাদিসে কোরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ রাখার মাধ্যমে জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ দুনিয়াতে যে ব্যক্তি কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলবেন, নিয়মিত তিলাওয়াত করবেন এবং এর শিক্ষা অনুসারে জীবন পরিচালনা করবেন, পরকালেও তিনি এর সুফল লাভ করবেন।

পবিত্র কোরআন হিফজ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। তবে শুধু মুখস্থ করাই যথেষ্ট নয়; বরং কোরআনের আয়াতগুলো শুদ্ধভাবে পড়া, নিয়মিত পুনরাবৃত্তি করা, অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর নির্দেশনা অনুসরণ করাও জরুরি। কোরআন যেন শুধু স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কাজে প্রতিফলিত হয়—এটাই হওয়া উচিত প্রত্যেক মুসলমানের প্রত্যাশা।

Advertisements