২৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১২ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

শুয়ে পড়লেই কাশি বাড়ে কেন? জেনে নিন করণীয়

Health-GettyImages-2149792299-5f

দিনের বেলায় তেমন সমস্যা না হলেও রাতে বিছানায় শোয়ার পর অনেকের কাশি বেড়ে যায়। কখনো গলায় খুসখুসে অনুভূতি, কখনো একটানা শুকনো কাশি, আবার কখনো কফের কারণে ঘুম ভেঙে যায়। বিশেষ করে বায়ুদূষণ বেশি থাকলে এ ধরনের সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। দূষিত বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র কণা ও ক্ষতিকর উপাদান শ্বাসনালিতে প্রদাহ এবং জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে কাশির প্রবণতা বাড়াতে পারে।

তবে রাতের কাশির জন্য শুধু বায়ুদূষণকে দায়ী করা ঠিক নয়। নাক দিয়ে গলার পেছনে শ্লেষ্মা নেমে আসা, হাঁপানি, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, অ্যালার্জি কিংবা ঘরের ভেতরের ধুলাবালি ও ধোঁয়াও এর কারণ হতে পারে। সমস্যার উৎস বুঝতে পারলে কাশি কমানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।

বায়ুদূষণ কীভাবে কাশির সমস্যা বাড়ায়?

বাতাসে থাকা ধুলাবালি, ধোঁয়া এবং ক্ষতিকর গ্যাস শ্বাস নেওয়ার সময় শরীরে প্রবেশ করে। বিশেষ করে পিএম২.৫ (PM2.5) নামের অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা ফুসফুসের গভীরে পৌঁছাতে পারে। এসব কণা শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, যার প্রতিক্রিয়ায় কাশি দেখা দেয়।

শ্বাসনালিতে ধুলাবালি বা বিরক্তিকর উপাদান প্রবেশ করলে শরীর কাশির মাধ্যমে সেগুলো বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে গলা শুকিয়ে যাওয়া, খুসখুসে অনুভূতি এবং কফের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যাদের হাঁপানি, অ্যালার্জি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দূষণের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে আগে থেকে কোনো শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা না থাকলেও দূষিত বাতাসের কারণে কাশি ও গলায় অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

রাতে কাশি বেড়ে যাওয়ার চারটি সম্ভাব্য কারণ

১. নাক থেকে গলার পেছনে শ্লেষ্মা নেমে আসা

নাক ও সাইনাসে তৈরি হওয়া শ্লেষ্মা গলার পেছন দিয়ে নেমে এলে বারবার কাশির অনুভূতি হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে পোস্টনাজাল ড্রিপ (Postnasal drip) বলা হয়। শুয়ে পড়লে গলার পেছনে শ্লেষ্মা জমার অনুভূতি বেশি হতে পারে, ফলে রাতে কাশি বাড়ে।

Advertisements

সাধারণত অ্যালার্জি, সর্দি, সাইনাসের প্রদাহ কিংবা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণে এমন সমস্যা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে নাক বন্ধ থাকা, হাঁচি, গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা এবং গলায় শ্লেষ্মা আটকে থাকার অনুভূতিও থাকতে পারে।

২. হাঁপানির উপসর্গ

হাঁপানিতে আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে রাতের দিকে কাশি, বুক চেপে আসা কিংবা শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। ঘুমের সময় শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তন এবং শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

দিনের বেলায় ধুলাবালি, ধোঁয়া বা দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে এলে রাতের উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে রাতের কাশিই হাঁপানির অন্যতম লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। তাই নিয়মিত রাতে কাশি হলে, বিশেষ করে সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

৩. অ্যাসিড রিফ্লাক্স

পাকস্থলীর অ্যাসিড বা অন্যান্য উপাদান খাদ্যনালি দিয়ে ওপরে উঠে এলে তাকে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বলা হয়। খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বাড়তে পারে। অ্যাসিড বা পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালিকে উত্তেজিত করলে গলায় অস্বস্তি ও কাশি তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যায় বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর কিংবা মুখে টক স্বাদ অনুভূত হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ থাকে না। রাতের খাবার খেয়েই বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস থাকলে খাবার ও ঘুমের মধ্যবর্তী সময় বাড়ানো উপকারী হতে পারে।

৪. ঘরের ধুলাবালি, ধোঁয়া ও অ্যালার্জি

শুধু বাইরের বাতাস নয়, ঘরের ভেতরের পরিবেশও রাতের কাশির জন্য দায়ী হতে পারে। বিছানার চাদর, বালিশ, পর্দা ও কার্পেটে জমে থাকা ধুলাবালি, ধুলার মাইট, পোষা প্রাণীর লোম কিংবা ছত্রাকের কণা সংবেদনশীল ব্যক্তিদের অ্যালার্জি বাড়াতে পারে।

এ ছাড়া সিগারেটের ধোঁয়া, মশার কয়েল, ধূপ এবং রান্নার ধোঁয়া শ্বাসনালিতে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। রাতে দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে থাকার কারণে এসব উপাদানের সংস্পর্শে কাশি বাড়তে পারে। তাই শোবার ঘর পরিষ্কার রাখা এবং ধোঁয়া তৈরি করে এমন উপাদানের ব্যবহার কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে কাশি কমাতে ঘরোয়া উপায়ে কী করবেন?

কাশির কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ অভ্যাস গলার অস্বস্তি কমাতে এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাত নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

বায়ুমানের দিকে খেয়াল রাখুন

বাইরে যাওয়ার আগে স্থানীয় বায়ুমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) দেখে নেওয়া ভালো। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং খোলা জায়গায় ব্যায়াম সীমিত রাখুন। বাইরে থেকে ফিরে হাত-মুখ পরিষ্কার করুন এবং প্রয়োজন হলে পোশাক পরিবর্তন করুন।

ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন

বাইরের বাতাস বেশি দূষিত থাকলে এবং ঘরের ভেতরের বাতাস তুলনামূলক পরিষ্কার হলে জানালা বন্ধ রাখা যেতে পারে। সামর্থ্য থাকলে উপযুক্ত HEPA ফিল্টারযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যায়। তবে ঘরের ভেতরের দূষণের উৎস দূর করাও জরুরি। রান্নার সময় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং ধোঁয়া জমতে দেবেন না।

ধুলাবালি ও ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন

শোবার ঘর নিয়মিত পরিষ্কার করুন। বিছানার চাদর ও বালিশের কভার ধুয়ে রাখুন এবং ধুলা জমে এমন জিনিসের পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিন। ঘরের ভেতরে ধূমপান এড়িয়ে চলুন। মশার কয়েল, ধূপ কিংবা অন্য কোনো ধোঁয়া কাশি বাড়ালে সেগুলোর ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করুন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

শরীরে পানির ঘাটতি হলে গলা শুষ্ক হয়ে অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই সারা দিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। কুসুম গরম পানি পান করলে গলার খুসখুসে অনুভূতিতে সাময়িক আরাম মিলতে পারে। তবে পানি পান করলেই সব ধরনের কাশি সেরে যাবে, এমন নয়।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অল্প মধু কাশির অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কখনো মধু দেওয়া যাবে না। ডায়াবেটিস থাকলে মধু খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ঘুমানোর সময় মাথা ও শরীরের ওপরের অংশ উঁচু রাখুন

শুয়ে পড়লে কাশি বাড়লে মাথা ও শরীরের ওপরের অংশ কিছুটা উঁচু করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে পারেন। বিশেষ করে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা গলার পেছনে শ্লেষ্মা নেমে আসার সমস্যা থাকলে এতে কিছুটা উপকার পাওয়া যেতে পারে।

অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা থাকলে রাতের খাবার খাওয়ার পর অন্তত তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে বিছানায় যাওয়া ভালো। রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবার খাওয়া এবং যেসব খাবারে নিজের সমস্যা বাড়ে, সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।

হাঁপানি থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন

হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ থাকলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার করুন। রাতের কাশি বেড়ে গেলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা বাড়ানো, কমানো কিংবা বন্ধ করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করুন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

রাতের কাশি কয়েক দিন স্থায়ী হলেই যে গুরুতর রোগ হয়েছে, তা নয়। তবে কাশি দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা ঘুম ও দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটালে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা করবেন না:

  • কাশি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়া।
  • রাতে বারবার কাশির কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়া।
  • কাশির সঙ্গে জ্বর, ওজন কমে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা থাকা।
  • শ্বাস নেওয়ার সময় বাঁশির মতো শব্দ হওয়া কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া।
  • কাশির সঙ্গে রক্ত আসা।

তীব্র শ্বাসকষ্ট, প্রচণ্ড বুকে ব্যথা কিংবা ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।

মনে রাখতে হবে, রাতের কাশি নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়; এটি বিভিন্ন সমস্যার উপসর্গ হতে পারে। তাই শুধু ঘরোয়া উপায়ে কাশি চাপা দেওয়ার পরিবর্তে এর কারণ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, দূষণ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে রাতের কাশির সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

Advertisements