সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের, কত টাকা বাড়তে পারে?

পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৪ টাকা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, রমজানে খেজুরের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখতে আমদানি শুল্ক ও কর কমানোর দাবি তুলেছেন আমদানিকারকেরা।
আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, সরবরাহ ও সম্ভাব্য মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভোজ্যতেলের মূল্য সমন্বয় এবং খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সম্মতি দেয়নি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। তবে খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। ওই সময় খোলা সয়াবিন তেল ও পাম তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। তৎকালীন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এর আগে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি দাম বাড়ানোর দাবি জানালেও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার প্রতি লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। কমিশনের পক্ষ থেকে লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। সে সময় ভবিষ্যতে আবার দাম বাড়ানো হবে কি না, তা বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন বাণিজ্য সচিব।
এবার রমজানের আগে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নতুন করে ১৪ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব আসায় ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রস্তাবটি অনুমোদিত না হওয়ায় আপাতত নতুন কোনো মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
রমজানে খেজুরের চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়। ইফতারের অন্যতম প্রচলিত খাবার হওয়ায় এ সময় ফলটির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে আমদানিকারকেরা খেজুরের ওপর আরোপিত শুল্ক ও করের বোঝা কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
বৈঠকে আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে খেজুর আমদানিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ শতাংশের মতো শুল্ক ও করভার রয়েছে। তাদের অভিযোগ, শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভিত্তিমূল্য বেশি হওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানির মোট খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
আমদানিকারকদের মতে, খেজুরের ধরন, গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়মূল্য একেক রকম হলেও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সেগুলোর যথাযথ পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি। সাধারণ মানের খেজুর ও উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম খেজুরের ক্ষেত্রে একই ধরনের ভিত্তিমূল্য প্রয়োগ করা হলে তুলনামূলক কম দামি খেজুর আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর।
তারা আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজকে বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হওয়ায় পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকে ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা যুক্ত হলে আমদানির প্রক্রিয়া আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আমদানিকারকদের আশঙ্কা, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না হলে রমজানের আগে পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি ও বাজারে নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এর ফলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দাম বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির খেজুরের জাত, গুণগত মান এবং ক্রয়মূল্যের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, সৌদি আরব, মিসর, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে খেজুর আমদানি করা হয়। এসব দেশের খেজুরের জাত, মান ও বাজারমূল্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সব ধরনের খেজুরের জন্য একই ধরনের শুল্কায়নমূল্য নির্ধারণ করলে আমদানির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আমদানিকারকদের প্রস্তাব, পণ্যের প্রকৃত ইনভয়েস মূল্য এবং গুণগত মান বিবেচনা করে শুল্ক আরোপ করা হোক। তাদের মতে, এতে কম দামি ও সাধারণ মানের খেজুর আমদানির খরচ কমতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে বিভিন্ন দামের খেজুরের সরবরাহ বজায় রাখা সহজ হবে।
তারা আরও বলেন, ফল আমদানির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত নমনীয় ও বাস্তবসম্মত করব্যবস্থা চালু করা হলে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হবে। এর সুফল সাধারণ ক্রেতারাও পেতে পারেন, বিশেষ করে রমজানের মতো সময়ে যখন খেজুরের চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে।
আমদানি শুল্ক নির্ধারণ ও পরিবর্তনের দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। তাই খেজুর আমদানিকারকদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ছাড়ের সুবিধাগুলো দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। আমদানিকারকদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে খেজুরের শুল্ক ও কর কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এনবিআরের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও এখনো অনুমোদন পায়নি।
রমজানের আগে ভোজ্যতেল ও খেজুরের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় বাজারের চাহিদা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই মূল্য পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে হয়।
সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এবং খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হলেও কোনো বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন। রমজানের আগে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, আমদানির বাধা কমানো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা—এই তিনটি বিষয়ই আসন্ন মৌসুমে বাজার পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



