২৭ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১১ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

পেঙ্গুইনের প্রেমে জীবনের শিক্ষা!

149267744-56a008755f9b58eba4ae8f46-1792497831

ভালোবাসা মানেই কি দামি উপহার, বড় আয়োজন কিংবা আবেগঘন প্রতিশ্রুতি? নাকি প্রিয় মানুষের জন্য ছোট ছোট যত্ন, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া আর প্রতিদিন পাশে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের গভীরতা? অ্যান্টার্কটিকার এক দুর্গম দ্বীপে তিন মাস কাটিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন ভ্রমণলেখক পিটার জন ওয়াটসন। পেঙ্গুইনদের জীবন কাছ থেকে দেখতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, ভালোবাসার সৌন্দর্য অনেক সময় প্রকাশ পায় একেবারে সাধারণ কিছু আচরণের মধ্য দিয়ে।

ওয়াটসনের ‘কাউন্টিং পেঙ্গুইন’ বইয়ে উঠে এসেছে সেই অভিজ্ঞতার কথা। প্রায় দুই বছর আগে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের হয়ে পেঙ্গুইন গণনার কাজে অ্যান্টার্কটিক সার্কেলের প্রায় ২০০ মাইল উত্তরে অবস্থিত গৌডিয়ার দ্বীপে গিয়েছিলেন তিনি। জনবসতি থেকে বহু দূরের এই পাথুরে দ্বীপে প্রতিকূল আবহাওয়া আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে কাটানো দিনগুলো তাঁর জীবনে এক ভিন্ন উপলব্ধির জন্ম দেয়।

পাথুরে দ্বীপে অন্য রকম এক পৃথিবী

দ্বীপে পৌঁছেই পেঙ্গুইনদের কোলাহল ও বিচিত্র আচরণ ওয়াটসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কমলা ঠোঁট, গোলাপি পা আর মাথায় সাদা পালকের ছোঁয়ায় জেন্টু পেঙ্গুইনগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, স্থলে তাদের চলাফেরাও তেমন মজার। তবে পানির নিচে তাদের দক্ষতা একেবারেই অন্য রকম। দ্রুত সাঁতার কাটা থেকে শুরু করে গভীর পানিতে ডুব দেওয়া—প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তাদের।

কিন্তু পেঙ্গুইনদের প্রতি ওয়াটসনের আগ্রহ শুধু তাদের শারীরিক দক্ষতা কিংবা অদ্ভুত আচরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনযাপন, সঙ্গী নির্বাচন এবং ছানাদের প্রতি যত্নের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন সম্পর্কের এক গভীর শিক্ষা।

একটি নুড়িপাথরে ভালোবাসার প্রকাশ

Advertisements

বড়দিনের ঠিক আগে দ্বীপে পৌঁছানোর সুবাদে পেঙ্গুইনদের প্রজননকালীন আচরণ দেখার সুযোগ হয়েছিল ওয়াটসনের। এ সময় পুরুষ জেন্টু পেঙ্গুইন সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে বেছে নেয় একটি মসৃণ নুড়িপাথর। যত্ন করে সেই পাথরটি স্ত্রী পেঙ্গুইনকে উপহার দেয়। এরপর এমন আরও পাথর সংগ্রহ করে তৈরি হয় তাদের বাসা, যেখানে ডিম রাখা যায় তুলনামূলকভাবে শুকনো ও নিরাপদ পরিবেশে।

প্রকৃতির এই সাধারণ দৃশ্যই ওয়াটসনের কাছে ভালোবাসার এক অসাধারণ প্রতীক হয়ে ওঠে। অ্যান্টার্কটিকায় যাওয়ার কিছুদিন আগে তিনি নিজেও একটি নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। ফলে পেঙ্গুইনদের এই ছোট্ট উপহারের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সম্পর্কের এক নতুন অর্থ।

তাঁর উপলব্ধি, ভালোবাসার জন্য সব সময় বড় ঘোষণা কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ একসঙ্গে জমা হয়েই তৈরি করে গভীর সম্পর্ক। পেঙ্গুইনের দেওয়া একটি নুড়িপাথর তাই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে ভালোবাসার এক অর্থবহ প্রতীক।

অ্যাগি ও ছানাদের বেঁচে থাকার লড়াই

দ্বীপে কাটানো সময়ের মধ্যে ওয়াটসনের পরিচয় হয়েছিল অ্যাগি নামের এক বদমেজাজি পেঙ্গুইনের সঙ্গে। মানুষকে সহজে কাছে ঘেঁষতে না দেওয়া এই পেঙ্গুইন সুযোগ পেলেই তাঁর হাঁটুর পেছনে ঠোকর বসাত। পেঙ্গুইনদের জীবন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় অ্যাগির এই আচরণ যোগ করেছিল এক মজার অধ্যায়।

তবে সব অভিজ্ঞতা আনন্দের ছিল না। পেঙ্গুইনছানাদের সংখ্যা গণনা করতে গিয়ে ওয়াটসন দেখেছিলেন, প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াই কতটা কঠিন। প্রথম দফায় গণনা করা ছানাদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। শিকারির আক্রমণ কিংবা খাড়া পাহাড়ি ঢাল থেকে পড়ে যাওয়ার মতো নানা কারণে প্রাণ হারিয়েছিল অনেক ছানা।

এই ক্ষতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বেঁচে থাকা ছানাদের প্রতি মমতা যেমন অনুভব করেছিলেন, তেমনই হারিয়ে যাওয়া ছানাদের জন্যও হয়েছিল তাঁর মন খারাপ। নিজের লেখায় তাদের ‘আমার ছানা’ বলে উল্লেখ করে তিনি বুঝিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে কোনও প্রাণীর জীবন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তার প্রতিও গভীর মায়া জন্ম নিতে পারে।

নতুনের পেছনে ছোটা নয়, প্রাপ্তির মূল্য বোঝা

অ্যান্টার্কটিকার নিঃসঙ্গ পরিবেশ ওয়াটসনকে শুধু ভালোবাসা নয়, জীবন সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। আগে তিনি নিয়মিত নতুন অভিযানের খোঁজে ছুটতেন। অজানা জায়গা দেখা, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পরবর্তী রোমাঞ্চের অপেক্ষায় থাকাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম আকর্ষণ।

কিন্তু পেঙ্গুইনদের সঙ্গে কাটানো সময় তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছে, সব সময় নতুন কিছু অর্জনের চেষ্টা করাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। কখনো কখনো ইতিমধ্যে যা পাওয়া হয়েছে, তার মূল্য উপলব্ধি করাও সমান জরুরি।

ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই তাঁর আগে থেকে রয়েছে। সেগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার জন্য শুধু নতুন কিছুর পেছনে নিরন্তর ছুটে চলা থেকে একটু বিরতি নেওয়া প্রয়োজন।

প্রকৃতির কাছ থেকে মানুষের শিক্ষা

পেঙ্গুইনদের জীবন মানুষের মতো নয়, তাদের আচরণকেও সরাসরি মানুষের সম্পর্কের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। তবু তাদের বাসা তৈরির চেষ্টা, ছানাদের বেঁচে থাকার লড়াই এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার দৃশ্য মানুষের মনে নানা ভাবনার জন্ম দিতে পারে।

পিটার জন ওয়াটসনের কাছে সেই অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা ছিল—ভালোবাসা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, তা যত্ন ও দায়িত্বের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়। একইভাবে সুখ মানেই নতুন কিছু পাওয়া নয়; বরং জীবনে ইতিমধ্যে থাকা সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তিগুলোকে মূল্য দিতে শেখাও সুখী হওয়ার একটি পথ।

দূর অ্যান্টার্কটিকার একটি ছোট্ট পাথুরে দ্বীপে পেঙ্গুইনদের পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ওয়াটসন যেন নিজের জীবনকেই নতুন করে চিনেছেন। একটি নুড়িপাথর, কয়েকটি পেঙ্গুইনছানা আর নিঃসঙ্গ পরিবেশের অভিজ্ঞতা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছে—জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়গুলো অনেক সময় আমাদের চোখের সামনেই থাকে। শুধু সেগুলোর গুরুত্ব বুঝতে একটু থামতে হয়।

Advertisements