২৬ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১০ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

যে মেলায় পুরুষের প্রবেশ নিষেধ, নারীরাই ক্রেতা

যে মেলায় পুরুষের প্রবেশ নিষেধ, নারীরাই ক্রেতা
অমর চাঁদ গুপ্ত অপু, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা

রেশমি চুড়ি, আলতা, চিরুনি, হাঁড়ি-পাতিল, খুন্তি-কড়াই, পানের বাটা, খেলনা, মিষ্টান্ন কী নেই এখানে। হরেক রকম পণ্যের পসরা মেলা চত্বরে। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের সবাই নারী। শিশুরা থাকলেও নারীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। দোকানদার ছাড়া সেখানে কোনো পুরুষ সদস্যের ঢোকার অনুমতি নেই। এভাবে নারীদের বেশি অংশগ্রহণের কারণে এর নামকরণ হয়েছে ‘বউ মেলা’।

সনাতনী ধর্মালম্বীদের শ্রীশ্রী লক্ষ্মীপূজাকে কেন্দ্র করে পূজার পরদিন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরএলাকার সুজাপুর দুর্গা মন্ডপ চত্বরে সাত দশকের বেশি সময় ধরে বসছে
এই ‘বউ মেলা’। দিনব্যাপী এ মেলায় ঘুরে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনে থাকেন। অন্যবারের ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) এ মেলা বসেছে।

এর আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) একই জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছে শ্রীশ্রী লক্ষ্মীদেবীর পূজাঅর্জনা। সকাল থেকেই ‘বউ মেলায়’ নারীদের ঢল নামে। ঐতিহ্যবাহী এই বউ মেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ী উপজেলাসহ আশপাশের উপজেলার সনাতন ধর্মালম্বী নারীদেরও আগমন ঘটে। বউমেলায় কেনাকাটা করতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী অর্পণা রানী, রিনি রানী, লিপি রানী, গৃহবধূ মুক্তা রানী, পূজা রানী, কল্পনা রানীসহ একাধিক নারী বলেন, লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে প্রতিবছর এই ঐতিহ্যবাহী বউমেলা হয়ে থাকে।

মেলায় শুধু নারীরাই ক্রেতা হওয়ায় নির্বিঘ্নে মেলায় অবস্থান করাসহ কেনাকাটা করা যায়। তবে মেলায় আসলে খুব আনন্দ লাগে। অনেক পরিচিত নারী ও আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা পাওয়া যায়। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায়। বউমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নিকট আত্মীয়-স্বজন বাড়ীতে আসেন। সবাই মিলে মেলায় ঘোরাঘুরি আর আড্ডা দেওয়া সহ মেলার আনন্দ উপভোগ করা যায়।

মেলায় আসা নববধূ অনামিকা রায় ও টুম্পা শর্মা বলেন, বরসহ এসেছিলেন মেলায়। কিন্তু মেলায় পুরুষের প্রবেশাধিকার না থাকায় বরকে বাইরে রেখে একা একাই মেলায় কেনাকাটা করতে হয়েছে। মেলার গেটে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চন শর্মা ও পলাশ রায়সহ একাধিক পুরুষ বলেন, বউমেলাতে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ তবুও নিজেদের বউ, বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হয়েছে। তারা ভেতরে কেনাকাটা করছে। তাদের ঘোরাফেরাসহ কেনাকাটা শেষ হলে তাদেরকে নিয়ে এক সঙ্গে বাড়ি ফিরবেন। মেলাটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই একই নিয়মে পরিচালিত হয়ে আসছে।

প্রসাধন সামগ্রী বিক্রেতা হেলাল উদ্দিন বলেন, বউ মেলার আগত ক্রেতা সকলেই নারী হওয়ায় মেলায় প্রসাধন সামগ্রীই বেশি বিক্রি হয়। নারীদের প্রসাধনীর পাশাপাশি
শিশুদের খেলনা সামগ্রীও বেচাবিক্রি ভালো হয়েছে এবার। মেলার আয়োজক সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অশেষ রঞ্জন দাস ও সাধারণ সম্পাদক গৌর চন্দ্র সরকার বলেন, লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে প্রতিবছর পূজার পরদিন বউ মেলার হয়ে থাকে।

Advertisements

প্রায় ৭০ বছর আগে মেলাটি শুরু করেন সুজাপুরের জমিদার বিমল বাবু। দেশ বিভাগের পর জমিদার বিমল বাবু স্বপরিবারে ভারতে চলে গেলেও তার রেখে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী বউ মেলাটি সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে প্রতি বছর হয়ে আসছে। মেলাটি জমিদারের আমল থেকেই শুধুমাত্র নারীদের জন্যই আয়োজন করা হয়। এ কারণে এখনও মেলায় কোন পুরুষকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। মেলার স্বেচ্ছাসেবকেরাও কেউ মেলায় প্রবেশ করতে পারেন না। অন্যবারের তুলনায় এবারের বউ মেলায় উৎসবের আমেজ বেশি। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে শতাধিক দোকানি। সকাল থেকেই দোকানে দোকানে নারী ক্রেতার ভিড় ছিল। মেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্দিরের স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন। তবে পুলিশ সদস্যরাও সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন।

থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বউ মেলাটির সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, বউ মেলার বিষয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কেউ কোনো কিছু জানায়নি। ফলে বিষয়টির সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

Advertisements