২৬ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১০ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

তপ্ত মরুভূমিতে মাটির নিচে বাড়ি বানান যে দেশের মানুষ

IMG_6f1eeb41-7912-4592-a624-b8a0669b7454

চারদিকে ধু ধু মরুভূমি। মাথার ওপর প্রখর সূর্য, বাইরে তীব্র গরম। এমন পরিবেশে যেখানে সাধারণ বাড়ির ভেতরেও স্বস্তি পাওয়া কঠিন, সেখানে মাটির নিচে বসবাস করছেন একদল মানুষ। অবাক করার মতো হলেও উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে এমন বাড়ির দেখা মেলে। বাইরে থেকে এগুলোকে মনে হয় বিশাল কোনো গর্ত। অথচ ভেতরে রয়েছে শোবার ঘর, রান্নাঘর ও বসার জায়গাসহ সংসারের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা। প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকার এই অসাধারণ কৌশল বহু বছর ধরে ধরে রেখেছে তিউনিসিয়ার মাতমাতা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ভূগর্ভস্থ বাড়িগুলো।

মাটির নিচে বাড়ি তৈরির কৌশল

তিউনিসিয়ার মাতমাতা অঞ্চলে আমাজিগ বা বারবার জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িগুলো বিশেষভাবে পরিচিত। এসব বাড়ি তৈরির পদ্ধতিও বেশ ব্যতিক্রমী। প্রথমে মাটির গভীরে একটি বড়, খোলা উঠান খোঁড়া হয়। এরপর উঠানের চারপাশের মাটি কেটে তৈরি করা হয় একাধিক কক্ষ। উঠান থেকেই এসব ঘরে প্রবেশ করা যায়।

বাইরে থেকে দেখলে বাড়ির অস্তিত্ব সহজে বোঝা যায় না। দূর থেকে মনে হয়, মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে রয়েছে একের পর এক গর্ত। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সাধারণ বাড়ির মতোই সেখানে রয়েছে বসবাসের উপযোগী কক্ষ। কোথাও বিছানা, কোথাও রান্নার সরঞ্জাম, আবার কোথাও পরিবারের সদস্যদের বসার ব্যবস্থা।


প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচার প্রাকৃতিক উপায়


মাটির নিচে বাড়ি তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ এই অঞ্চলের শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া। গ্রীষ্মকালে মরুভূমি-সংলগ্ন এলাকায় তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। সূর্যের তাপে সাধারণ বাড়ির ছাদ ও দেয়াল উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ ঘরে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে না। চারপাশের পুরু মাটির স্তর বাইরের তাপ ঘরের ভেতরে পৌঁছানোর গতি কমিয়ে দেয়।

Advertisements

ফলে দিনের প্রচণ্ড গরমেও এসব বাড়ির ভেতর তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ বজায় থাকে। রাতের বেলায় বাইরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে গেলেও মাটির নিচে তাপমাত্রার পরিবর্তন তুলনামূলক ধীর হয়। এতে ঘরের ভেতরে আরামদায়ক পরিবেশ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া মরুভূমির প্রবল বাতাস ও উড়ন্ত বালুর সরাসরি প্রভাব থেকেও ভূগর্ভস্থ বাড়িগুলো কিছুটা সুরক্ষা দেয়। স্থানীয় মাটি ও ভূপ্রকৃতি উপযোগী হওয়ায় সেখানে এই ধরনের বাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

ঐতিহ্য থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ

এই বাড়িগুলো কেবল আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা এই স্থাপত্যরীতি ব্যবহার করে আসছেন। তবে বর্তমানে তিউনিসিয়ার সবাই এমন বাড়িতে থাকেন না। আধুনিক জীবনযাত্রার প্রসারের সঙ্গে অনেকেই প্রচলিত বাড়িতে বসবাস করছেন।

মাতমাতার ভূগর্ভস্থ বাড়ি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও বেশ পরিচিত। ‘স্টার ওয়ার্স’ চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্য ধারণের জন্য এখানকার একটি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই বাড়িটি বর্তমানে হোটেল সিদি দ্রিস নামে পরিচিত।
প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে মাটির নিচে বাড়ি তৈরির এই রীতি মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেও প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য বুঝে কীভাবে আরামদায়ক আবাস গড়ে তোলা যায়, তিউনিসিয়ার এই ভূগর্ভস্থ বাড়িগুলো তারই জীবন্ত নিদর্শন।

Advertisements