কক্সবাজারের নীল জলেই মৃত্যুফাঁদসাগরে গোসলে নেমে এত মৃত্যু, কারণ কী?

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আনন্দ করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক পর্যটক। গত ১২ বছরে সৈকতে গোসল করতে নেমে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সাগরের স্রোতে ভেসে যাওয়া অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রাকৃতিক ঝুঁকির পাশাপাশি পর্যটকদের অসতর্কতা এবং নিরাপত্তাবিধি অমান্য করার প্রবণতা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা আবারও সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দুর্ঘটনার পর পর্যটকদের সতর্ক করতে প্রচার জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। তবে সৈকতে সরেজমিনে দেখা যাচ্ছে, লাল নিশানা ও লাইফগার্ডের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অনেকেই পানিতে নামছেন।
প্রকৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদ
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো গুপ্তখাল। সৈকতের বালুর নিচে থাকা এসব খাল ও গভীর গর্ত জোয়ারের সময় পানিতে ঢেকে যায়। ফলে বাইরে থেকে সেগুলোর অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। অসতর্কভাবে পানিতে নামলে পর্যটকেরা এসব খালে আটকে যেতে পারেন কিংবা পানির গভীরে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বৈরী পরিবেশের কারণে সৈকতের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ১২ থেকে ১৫টি গুপ্তখাল ও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। জোয়ারের সময় এগুলো পানির নিচে চলে যাওয়ায় পর্যটকেরা সহজেই বিপদে পড়ছেন। উদ্ধারকর্মীদের জন্যও পরিস্থিতি জটিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, সৈকতের কোথাও গর্তে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে বিশেষায়িত ডুবুরি না থাকায় কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সতর্কবার্তা আছে, মানার প্রবণতা কম
ছুটির দিনে কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকদের বিপুল সমাগম ঘটে। গত শুক্রবার সুগন্ধা পয়েন্টে দুপুরে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটকের উপস্থিতি দেখা যায়, যা বিকেলে বেড়ে প্রায় ৯০ হাজারে পৌঁছায়। কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায়ও হাজার হাজার মানুষ গোসল ও জলক্রীড়ায় অংশ নেন।
সৈকতে একাধিক লাল নিশানা উড়ছিল। লাইফগার্ডরা বাঁশি বাজিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পর্যটকদের সরে যেতে বলছিলেন। কিন্তু অনেকে সতর্কতা উপেক্ষা করে গোসল চালিয়ে যান। কারও হাতে ছিল ভাসমান টিউব, কেউ আবার জেটস্কিতে চড়ে গভীর পানির দিকে যাচ্ছিলেন। শিশু-কিশোরদেরও অনেককে লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামতে দেখা যায়।
লাইফগার্ডদের মতে, সাঁতার না জানা পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাবিধি অনুসরণের প্রবণতা কম। অনেকেই মনে করেন, অল্প পানিতে দাঁড়িয়ে গোসল করলে বিপদের আশঙ্কা নেই। অথচ সমুদ্রের স্রোত, জোয়ার-ভাটা ও পানির নিচের গর্ত মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। সি-সেফ ও বিচকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী পয়েন্টে সাগরে ভেসে যাওয়া অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়। ওই দিন এসব পয়েন্টে প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও উদ্ধারকর্মীদের নিয়মিত হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পর্যটকের চাপ সামলানো কঠিন
হোটেল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতে অন্তত ছয় লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষের একসঙ্গে সমুদ্রে নামা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নিয়োগ করা বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান জানান, নির্দেশনা অমান্য করে গোসলে নামার কারণে প্রতিদিনই ২০ থেকে ২৫ জন পর্যটক বিপদের মুখে পড়ছেন বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা। জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার অবস্থা না জেনে পানিতে নামলে স্রোতে ভেসে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ২১ অক্টোবর হিমছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ১২ জনের একটি পর্যটক দল গোসল করতে নামে। পরে গুপ্তখালে আটকা পড়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু সতর্কবার্তা প্রচার করলেই হবে না; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থাও জরুরি।
নিরাপদ গোসলের জন্য প্রশাসনের ১০ নির্দেশনা
দুর্ঘটনা কমাতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন পর্যটকদের জন্য ১০টি নির্দেশনা প্রচার করছে। লিফলেট, বিলবোর্ড ও ডিজিটাল মাধ্যমে এসব নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনাগুলো হলো—
১. সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে নামতে হবে।
২. লাল নিশানা দেওয়া স্থানে গোসল করা যাবে না।
৩. লাইফগার্ডের নির্দেশনা ও সতর্কবার্তা মেনে চলতে হবে।
৪. বিকেল পাঁচটার পর সমুদ্রে নামা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. পানিতে নামার আগে জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার অবস্থা জেনে নিতে হবে।
৬. লাইফগার্ড নেই এমন এলাকায় গোসল করা যাবে না।
৭. ভাসমান বস্তু নিয়ে পানিতে নামার আগে বাতাসের গতি সম্পর্কে জানতে হবে।
৮. শিশুদের কখনো একা সমুদ্রে নামতে দেওয়া যাবে না।
৯. অসুস্থ বা শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় হাঁটুপানির বেশি গভীরে যাওয়া যাবে না।
১০. যেকোনো পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজন
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পর্যটকদের নিরাপদে গোসল করার বিষয়ে বিভিন্নভাবে সচেতন করা হচ্ছে। তবে অনেক পর্যটক নিয়ম মেনে চলেন না। একই সময়ে কয়েক লাখ মানুষ উন্মুক্ত সৈকতে নামলে তাঁদের প্রত্যেককে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শহরের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার বাইরে অরক্ষিত সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পর্যটকদের সচেতনতার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা, লাইফগার্ডের উপস্থিতি বাড়ানো, উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বিশেষ করে হিমছড়ির মতো তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত উদ্ধারব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর লাখো মানুষ ছুটে আসেন। কিন্তু সমুদ্রের সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা বিপদকে অবহেলা করলে আনন্দের ভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হতে পারে শোকাবহ ঘটনায়। তাই পর্যটকদের সচেতনতা, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থার সমন্বয়ই পারে সমুদ্রসৈকতে প্রাণহানি কমাতে।



