একাকিত্ব ঘোচাতে চীনে বাড়ছে ‘সঙ্গী ভাড়া’র অর্থনীতি

একসঙ্গে পাহাড়ে হাঁটা, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, কেনাকাটা কিংবা নিছক গল্প করা—বন্ধুত্বের পরিচিত অভিজ্ঞতাগুলোই এখন চীনে পরিণত হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সেবায়। একাকিত্ব, ব্যস্ত জীবন আর তরুণদের কর্মসংস্থানের চাহিদা মিলিয়ে গড়ে উঠছে নতুন এক অর্থনীতি।
কখনো মন খারাপের দিনে কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। কখনো নতুন শহরে ঘুরতে গিয়ে মনে হয়, পাশে একজন সঙ্গী থাকলে ভালো হতো। আবার রেস্তোরাঁয় একা বসে খাওয়া কিংবা পাহাড়ি পথে একা হাঁটার অভিজ্ঞতাও অনেকের কাছে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার। এমন মুহূর্তে যদি অর্থের বিনিময়ে কাউকে পাশে পাওয়া যায়, কেমন হয়? চীনে এই ভাবনাই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে নতুন এক সেবাবাজারে। নাম ‘কম্প্যানিয়নশিপ ইকোনমি’ বা সঙ্গীসেবার অর্থনীতি। এখানে অর্থের বিনিময়ে পাওয়া যায় গল্প করার মানুষ, ভ্রমণসঙ্গী, গেম খেলার সঙ্গী কিংবা কেনাকাটায় সাহায্য করার মতো কাউকে। সেবাটি কেবল শারীরিক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রে এর মূল আকর্ষণ হলো মনোযোগ, কথোপকথন ও মানসিক স্বস্তি।
২০২৬ সালের জুনে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই খাতের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউয়ান বা ৭.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এ খাতের আকার নিয়ে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে সংখ্যাটিকে আনুমানিক হিসাব হিসেবেই দেখা উচিত।
বন্ধুত্ব যখন বুকিং দিয়ে পাওয়া যায়
ধরা যাক, কেউ একা একটি শহরে বেড়াতে গেছেন। শহরটি তাঁর অচেনা, ছবি তুলে দেওয়ার মতো কেউ নেই, আবার একা একা ঘুরতেও ভালো লাগছে না। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুঁজে নিলেন একজন ভ্রমণসঙ্গী। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে ঘুরবেন, ছবি তুলে দেবেন, গল্প করবেন কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাগ বহন করতে সাহায্য করবেন। বিনিময়ে তাঁকে দিতে হবে নির্ধারিত অর্থ। চীনের সঙ্গীসেবা বাজারে এমন অভিজ্ঞতা ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে। কেউ পাহাড়ে ওঠার জন্য সঙ্গী খোঁজেন, কেউ রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার জন্য, আবার কেউ চান এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে নির্দ্বিধায় নিজের কথা বলা যাবে। অনলাইন গেম খেলা থেকে শুরু করে কেনাকাটা কিংবা শহর ঘুরে দেখার মতো কাজেও মিলছে অর্থের বিনিময়ে সঙ্গ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সেবাদাতারা নিজেদের পরিচয়, দক্ষতা, পছন্দের কার্যক্রম এবং পারিশ্রমিকের বিবরণ প্রকাশ করেন। গ্রাহকেরাও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী সঙ্গী বেছে নিতে পারেন। কিছু সেবায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টেক্সট বার্তা, ভয়েস কল কিংবা ভিডিও কলে কথোপকথনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এখানে পণ্যটি কোনো বস্তু নয়; বরং সময়, মনোযোগ এবং একটি ভাগ করে নেওয়া অভিজ্ঞতা। যে কাজগুলো একসময় বন্ধু বা পরিচিত মানুষের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা হতো, তার কিছু অংশই এখন সেবার আকারে বিক্রি হচ্ছে।
একাকিত্বই কি নতুন বাজারের মূলধন?
সঙ্গী ভাড়া করার প্রবণতাকে শুধু নতুন ব্যবসায়িক ধারণা হিসেবে দেখলে এর পেছনের সামাজিক বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, কর্মক্ষেত্রের চাপ, একা বসবাস, বদলে যাওয়া সম্পর্কের ধারণা এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান জটিলতা।
চীনের অনেক তরুণ পড়াশোনা ও চাকরির জন্য পরিবার থেকে দূরে থাকেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাপনের কারণে বন্ধুত্ব ধরে রাখা কিংবা নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সময় ও সুযোগ সব সময় মেলে না। কেউ বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ একা থাকার স্বাধীনতা বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু স্বাধীনভাবে জীবন কাটানোর পাশাপাশি অনেকেরই প্রয়োজন হচ্ছে কথা বলার মানুষ কিংবা অবসর ভাগ করে নেওয়ার সঙ্গী।
সিঙ্গাপুরের চ্যানেল নিউজ এশিয়াকে দেওয়া বিশ্লেষণে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইস্ট এশিয়ান ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা বলেছেন, এই প্রবণতা ভোগের ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মানুষ এখন কেবল বস্তু কেনার পরিবর্তে অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও মানসিক তৃপ্তির জন্যও অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী।
এখানেই সঙ্গীসেবার অর্থনীতি নতুন তাৎপর্য পায়। নিঃসঙ্গতা যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সেখানে সেটি দূর করার চেষ্টাই হয়ে উঠছে বাজারের একটি সেবা।
তরুণদের আয়ের নতুন পথ
এই বাজারের আরেকটি দিক হলো কর্মসংস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ ফ্রিল্যান্সার কিংবা স্থায়ী চাকরির বাইরে আয় করতে আগ্রহীরা নিজেদের সময় ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সঙ্গীসেবা দিচ্ছেন। কারও শক্তি ভ্রমণ পরিকল্পনায়, কেউ ভালো গল্প করতে পারেন, কেউ আবার ছবি তোলা, গেম খেলা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রমে সঙ্গ দেওয়ায় দক্ষ।
রয়টার্সের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে চীনের শানডং প্রদেশের এক উদ্যোক্তার কথা উঠে এসেছে, যিনি পাহাড়ে ওঠার সঙ্গী দেওয়ার ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩৭০ হয়েছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে কাজ করে মাসে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ইউয়ান আয়ের কথা জানিয়েছেন। এসব উদাহরণ দেখায়, ব্যক্তিগত সঙ্গ দেওয়ার কাজও কারও কারও জন্য নিয়মিত আয়ের উৎস হয়ে উঠছে।
সঙ্গীসেবার বাজারে তাই একই সঙ্গে রয়েছে দুটি চাহিদা—একদিকে মানুষের সময় ও মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নমনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ। প্রচলিত চাকরির বাইরে নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করতে পারা তরুণদের কাছে এ ধরনের কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সঙ্গ, নাকি সত্যিকারের সম্পর্ক?
সঙ্গী ভাড়া করার ধারণাটি যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই জটিল এর আবেগগত দিক। কারণ মানুষের সম্পর্ক সাধারণত সময়, বিশ্বাস, পারস্পরিক যত্ন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সঙ্গের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নির্ধারিত থাকে সময়সীমা, সেবার ধরন ও পারিশ্রমিক।
এ ধরনের ব্যবস্থার সুবিধা হলো, গ্রাহক জানেন তিনি কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন এবং কতক্ষণ পাচ্ছেন। অপরিচিত কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অনিশ্চয়তা কিংবা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা এখানে তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। যাঁদের নতুন মানুষের সঙ্গে মিশতে অস্বস্তি হয়, তাঁদের জন্যও নির্দিষ্ট সময়ের কথোপকথন সহজ একটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এই সম্পর্কের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অর্থ দিয়ে কারও উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলেও আন্তরিকতা, গভীর বন্ধুত্ব কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সংযোগ নিশ্চিত করা যায় না। চ্যানেল নিউজ এশিয়ার প্রতিবেদনে কয়েকজন ব্যবহারকারী এমন সেবার কথোপকথনকে কৃত্রিম ও গতানুগতিক মনে হওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁদের কারও কারও কাছে মনে হয়েছে, কথোপকথনটি আন্তরিক যোগাযোগের চেয়ে নির্ধারিত সময় পার করার প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
নিঃসঙ্গতার সমাধান, নাকি নতুন ব্যবসায়িক বাস্তবতা?
চীনের সঙ্গী ভাড়া করার অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: মানুষ যখন সম্পর্কের জন্যও অর্থ ব্যয় করতে শুরু করে, তখন সামাজিক যোগাযোগের ধারণা কীভাবে বদলে যায়?
একদিকে এই সেবা একা ভ্রমণকারী, বয়স্ক মানুষ কিংবা সামাজিক যোগাযোগে অসুবিধা অনুভব করা ব্যক্তিদের জন্য বাস্তব সহায়তা দিতে পারে। অন্যদিকে, মানুষের মনোযোগ ও আবেগ যখন পণ্য বা সেবার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সম্পর্কের আন্তরিকতা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এই প্রবণতাকে কেবল মানুষের একাকিত্বের গল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে পরিবর্তিত জীবনযাপন, নতুন ভোগের অভ্যাস, তরুণদের আয়ের বিকল্প এবং আধুনিক শহুরে সমাজে সম্পর্ক গড়ে তোলার নতুন পদ্ধতির প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত, অর্থের বিনিময়ে কাউকে পাশে পাওয়া সম্ভব হলেও মানুষের জীবনে স্থায়ী সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। সঙ্গীসেবা হয়তো একটি নিঃসঙ্গ বিকেলকে আনন্দময় করতে পারে, অচেনা শহরকে পরিচিত করে তুলতে পারে কিংবা কঠিন সময়ে কথা বলার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক যত্নের জায়গা তৈরি করতে প্রয়োজন সময়, বিশ্বাস এবং স্বতঃস্ফূর্ত মানবিক যোগাযোগ।
চীনের এই নতুন অর্থনীতি তাই শুধু সঙ্গী ভাড়া করার গল্প নয়; এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন মানুষের জীবনে যোগাযোগের মাধ্যম বাড়ছে, অথচ সেই যোগাযোগের মধ্যেও অনেকেই খুঁজছেন একটু আন্তরিক সঙ্গ।



