প্রথমবারের মতো শনাক্ত সবুজ রঙের নক্ষত্র

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন এক শ্বেত বামন নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন, যা মানুষের চোখে দেখা গেলে সবুজ দেখাত। একই গবেষণায় প্রায় গোলাপি রঙের আরেকটি শ্বেত বামন নক্ষত্রেরও সন্ধান মিলেছে। সম্প্রতি আরএএস টেকনিকস অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
শ্বেত বামন হলো সূর্যের মতো নক্ষত্রের জীবনের শেষ পর্যায়ের অবশিষ্টাংশ। নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এর বাইরের স্তর মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। অবশিষ্ট অংশটি পরিণত হয় অত্যন্ত ঘন বস্তুতে, যাকে বলা হয় শ্বেত বামন।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী মার্ক হল্যান্ডস। তাঁর নেতৃত্বে গবেষকেরা শ্বেত বামন নক্ষত্রের আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক রঙের নক্ষত্রগুলোর সন্ধান পান।
গবেষকদের ধারণা, শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে হিলিয়ামের সঙ্গে অন্যান্য মৌলের মিথস্ক্রিয়া এর আলোর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে। সবুজ দেখাতে পারে—এমন নক্ষত্রটির বাইরের স্তরে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম ও লিথিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
শ্বেত বামনের আশপাশে থাকা গ্রহাণু কিংবা পুরোনো গ্রহব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ থেকে বিভিন্ন মৌল নক্ষত্রটির বাইরের স্তরে জমা হতে পারে। কোনো গ্রহাণু শ্বেত বামনের খুব কাছে চলে এলে প্রবল মহাকর্ষীয় টানে সেটি ভেঙে যেতে পারে। পরে এর ধুলা ও পাথরের টুকরা নক্ষত্রটির ওপর পড়ে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে মিশে যায়।
এসব উপাদান বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহের গঠন সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। লোহা, ম্যাগনেশিয়াম ও সোডিয়ামের মতো মৌলের উপস্থিতি ও অনুপাত থেকে গ্রহটির উপাদান এবং গঠনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব।
গবেষণায় পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ১৫১টি পরিচিত শ্বেত বামন নক্ষত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি নক্ষত্রকে সম্ভাব্য সবুজ এবং অন্য একটিকে স্যামন মাছের মাংসের মতো গোলাপি দেখাতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। গোলাপি নক্ষত্রটির ক্ষেত্রে কার্বন অণুর উচ্চ ঘনত্ব এমন রঙের জন্য দায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নক্ষত্রগুলোর রং বিজ্ঞানীরা সরাসরি চোখে দেখে নির্ধারণ করেননি। বরং তাদের আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে হিসাব করেছেন, নক্ষত্রগুলো যথেষ্ট কাছে থাকলে মানুষের চোখে কেমন দেখাত।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডাম বার্গাসারের মতে, শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে থাকা উপাদান বিশ্লেষণ করে বহু আগেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহের গঠন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব।
গবেষণাটিতে আগে থেকে সংগ্রহ করা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এটি শ্বেত বামন সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন কোনো রহস্যের সমাধান করেছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে নক্ষত্রের সম্ভাব্য রং নির্ণয়ের পদ্ধতি ভবিষ্যতের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের মতে, এখনো অনেক শ্বেত বামন নক্ষত্রের বর্ণালিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। উন্নত প্রযুক্তি ও নতুন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এসব তথ্যের পরিমাণ বাড়লে আরও অস্বাভাবিক রঙের নক্ষত্র শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
মার্ক হল্যান্ডসের ধারণা, ভবিষ্যতে শ্বেত বামনের বর্ণালিসংক্রান্ত তথ্যের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বাড়তে পারে। এতে বর্তমানে শনাক্ত হওয়া এক বা দুটি সবুজ শ্বেত বামনের সংখ্যা বেড়ে ১০ থেকে ২০টিতেও পৌঁছাতে পারে।
সূত্র: সিএনএন



