খালি চোখে দেখা যায় না, সেই জীবের ছবিতেই বিশ্বজয়ী বাংলাদেশি কুতুব উদ্দিন

যে জগৎ খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য, সেখানেও লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর সৌন্দর্য। পচা কাঠের গায়ে জন্ম নেওয়া ক্ষুদ্র জীব, আর্দ্র মাটিতে বেড়ে ওঠা অদ্ভুত গঠন কিংবা শর্ষের দানার সমান জীবের শরীরে প্রকৃতির সূক্ষ্ম নকশা—এসবই ক্যামেরার চোখে আবিষ্কার করেন কুতুব উদ্দিন। ক্ষুদ্র জীবের সেই অদেখা জগৎকে আলোকচিত্রে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পেয়েছেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই আলোকচিত্রী।
২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ৬২তম ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতার পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। তাঁর পুরস্কারজয়ী ছয়টি ছবির সিরিজের নাম ‘সিক্রেট ওয়ার্ল্ড’। এতে ফুটে উঠেছে স্লাইম মোল্ডের প্রজননকাঠামো এবং তাদের অবিশ্বাস্য সূক্ষ্ম গঠন। পশ্চিম সাসেক্সের বিভিন্ন বনভূমিতে তোলা ছবিগুলো যেন দর্শককে পরিচিত প্রকৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অচেনা জগতে নিয়ে যায়।
পচা কাঠে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়
স্লাইম মোল্ড দেখতে অনেকটা ছত্রাকের মতো হলেও এটি ছত্রাক নয়; এটি একধরনের অ্যামিবাসদৃশ জীব। সাধারণত পচা কাঠ ও আর্দ্র পরিবেশে এদের দেখা মেলে। আকারে মাত্র এক থেকে দুই মিলিমিটার হওয়ায় খালি চোখে এদের সূক্ষ্ম গঠন ভালোভাবে দেখা কঠিন। কিন্তু ম্যাক্রো লেন্সের সাহায্যে কুতুব উদ্দিন সেই ক্ষুদ্র জীবের রং, আকৃতি ও বিন্যাসকে করেছেন স্পষ্ট ও জীবন্ত।
তাঁর সিরিজের একটি ছবির নাম ‘টাইনি ড্যান্সার’—বাংলায় যার অর্থ ‘খুদে নৃত্যশিল্পী’। ছবিতে পচা কাঠের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সরু লালচে-বাদামি ডাঁটার মাথায় দেখা যায় হলুদাভ গোলাকার অংশ, যার গায়ে ছড়িয়ে আছে কালো ছোপ। একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র গঠনগুলোকে দেখে মনে হয়, যেন তারা কোনো অদৃশ্য ছন্দে নাচছে।
আরেকটি ছবির নাম ‘আ ওয়ার্ল্ড ইন মিনিয়েচার’, অর্থাৎ ‘ক্ষুদ্র এক জগৎ’। এতে ধরা পড়েছে শর্ষের দানার সমান একটি স্লাইম মোল্ড। তার গঠন অনেকটা ক্ষুদ্র বনসাই গাছের মতো, আর মাথায় সাদা ফুলের মতো আকৃতি। এত ছোট একটি জীবের মধ্যে এমন নান্দনিক বিন্যাস যে থাকতে পারে, ছবিটি যেন সেই বিস্ময়ই সামনে নিয়ে আসে। কুতুবের আলোকচিত্রের বিশেষত্ব এখানেই—তিনি কেবল একটি জীবের ছবি তোলেন না, বরং তার এমন সব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেন, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অজানাই থেকে যায়।
শখের ক্যামেরা থেকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
কুতুব উদ্দিনের আলোকচিত্রযাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারেই ব্যক্তিগত ভালো লাগা থেকে। ২০১২ সালে জন্মদিনে স্ত্রী জমিলা পারভিন তাঁকে একটি ডিজিটাল ক্যামেরা উপহার দেন। সেই ক্যামেরা হাতে নিয়েই শুরু হয় প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার অভ্যাস।
প্রথম দিকে প্রজাপতি, মৌমাছি, ফুল, পাখি এবং আশপাশের পরিচিত দৃশ্যের ছবি তুলতেন তিনি। তখন আলোকচিত্র ছিল অবসরের শখ। পেশাগত জীবনে তিনি একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কাজের পাশাপাশি ছবি তোলার কৌশল শেখার চেষ্টা চালিয়ে যান। বই ও বিভিন্ন লেখা পড়ে, ইউটিউবে অভিজ্ঞ আলোকচিত্রীদের কাজ দেখে এবং নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করেন। ক্যামেরার লেন্সে প্রকৃতির নানা রূপ দেখতে দেখতে তাঁর আগ্রহও বদলাতে থাকে। সুন্দর দৃশ্য ধারণের পাশাপাশি তিনি উপলব্ধি করেন, আলোকচিত্রের মাধ্যমে এমন সব গল্প বলা সম্ভব, যা সাধারণত মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়।
এই উপলব্ধিই তাঁকে পেশাদার আলোকচিত্রীর পথে এগিয়ে দেয়। ২০১৮ সাল থেকে পেশাদারভাবে কাজ শুরু করেন কুতুব। ছবি বিক্রি, আলোকচিত্রবিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা এবং অন্যদের ছবি তোলার কৌশল শেখানোর মধ্য দিয়ে গড়ে তোলেন নিজের পরিচিতি। তবে শখকে পেশায় পরিণত করার পথ সহজ ছিল না। কুতুবের ভাষায়, “নিজের ভালোবাসার কাজকে পেশা হিসেবে নিতে পারাকে আমি সৌভাগ্য মনে করি। তবে শুধু ভালো ছবি তুলতে পারলেই হয় না। নিজের কাজের প্রচার, গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসার দিকটিও সামলাতে হয়।”
ক্ষুদ্র জগতের প্রতি মুগ্ধতা
প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে করতেই ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় কুতুবের। ছোট্ট একটি পোকামাকড়ের চোখ, শরীর কিংবা পায়ের সূক্ষ্ম গঠন ক্যামেরায় বড় করে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র প্রাণী, ছত্রাক ও স্লাইম মোল্ড হয়ে ওঠে তাঁর আলোকচিত্রের প্রধান বিষয়।
সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ‘ম্যাক্রোম্যান’ হিসেবে পরিচয় দেন কুতুব। নামটির মধ্যেই রয়েছে তাঁর কাজের প্রতি ভালোবাসার পরিচয়। তাঁর কাছে ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি মানে পরিচিত পৃথিবীকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিতে দেখা। আমরা প্রতিদিন গাছের গুঁড়ি দেখি, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটি কিংবা বনের ভেতর ঘুরে বেড়াই। কিন্তু এসবের আড়ালে কত বিচিত্র ক্ষুদ্র জীব বাস করে, তা সচরাচর খেয়াল করি না। ম্যাক্রো লেন্স সেই অদেখা জগৎকে সামনে নিয়ে আসে। কখনো কোনো জীবের গঠন এতটাই অদ্ভুত মনে হয় যে তাকে অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী বলেও ভুল হতে পারে।
এই অজানা জগৎ আবিষ্কারের জন্য কুতুবকে খুব দূরে যেতে হয় না। যুক্তরাজ্যের পশ্চিম সাসেক্সে তাঁর বাড়ির কাছেই রয়েছে স্লিন্ডন উডস, পুলবরো ব্রুকস ও হেসওর্থ কমনের মতো বনভূমি। এসব জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে ক্ষুদ্র জীবের খোঁজ করেন তিনি। বিশেষ করে বৃষ্টির পর ভেজা বনে যেতে পছন্দ করেন, কারণ আর্দ্র পরিবেশে স্লাইম মোল্ড ও বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক খুঁজে পাওয়ার সুযোগ বেশি।
একটি ছবির পেছনে শতাধিক ফ্রেম
ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে শুধু ভালো ক্যামেরা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ এবং আলোর ওপর সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ। কুতুব উদ্দিন ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করেন ক্যানন আর৫ ক্যামেরা ও ক্যানন এমপি-ই ৬৫ মিলিমিটার ম্যাক্রো লেন্স। এই লেন্সের সাহায্যে কোনো বিষয়কে এক থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বড় করে ধারণ করা যায়। আলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি ছোট এলইডি বাতি ও ডিফিউজার ব্যবহার করেন। ক্ষুদ্র জীবের শরীরের বিভিন্ন অংশকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে একাধিক ফোকাস পয়েন্টে ছবি তোলেন। পরে জেরিন স্ট্যাকার সফটওয়্যারের সাহায্যে ছবিগুলো একত্র করেন, যাতে পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।
একটি ভালো ছবি তৈরি করতে কখনো ৫০টি, কখনো ১০০টিরও বেশি ছবি তুলতে হয়। তাঁর একটি পুরস্কারজয়ী ছবির জন্যই ব্যবহার করতে হয়েছিল ১২৪টি ছবি। অর্থাৎ দর্শকের চোখে যে দৃশ্যটি একটি মুহূর্তের ছবি, তার পেছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি, নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি দক্ষতা।
তবে কুতুব মনে করেন, যন্ত্রপাতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বিষয়কে খুঁজে বের করার ক্ষমতা। তাঁর কথায়, “জঙ্গলে গিয়ে শুধু সামনে তাকিয়ে হাঁটি না। মাটির কাছাকাছি, গাছের গুঁড়ি, পচা কাঠ, পাতার নিচে এবং ভেজা জায়গায় মনোযোগ দিয়ে খুঁজি। কোথায় আর্দ্রতা বেশি, কোথায় কাঠ পচছে, কোথায় ক্ষুদ্র জীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে, এসব লক্ষ করি।” প্রকৃতির ছোট ছোট পরিবর্তন লক্ষ করার এই অভ্যাসই তাঁকে অন্যদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া বিষয় খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
শিকড় বাংলাদেশে, অনুসন্ধান বিশ্বজুড়ে
কুতুব উদ্দিনের জন্ম মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। পড়াশোনার জন্য ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। বর্তমানে তাঁর কাজের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে যুক্তরাজ্যের বনভূমি ও সেখানকার ক্ষুদ্র জীববৈচিত্র্য। তবে বাংলাদেশের প্রকৃতির প্রতিও রয়েছে তাঁর গভীর আগ্রহ। পরিবারের অন্য সদস্যরা বাংলাদেশে থাকেন। মাকে আগেই হারিয়েছেন; কয়েক মাস আগে মারা গেছেন তাঁর বাবাও। ব্যক্তিগত জীবনের এসব অভিজ্ঞতার মধ্যেও আলোকচিত্রের প্রতি ভালোবাসা ধরে রেখেছেন তিনি।
আগামী বছর বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এবার দেশে ফিরে বিশেষভাবে খুঁজতে চান স্লাইম মোল্ড ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জীব। তাঁর ধারণা, এমন কিছু প্রজাতি বাংলাদেশে পাওয়া যেতে পারে, যেগুলো তিনি যুক্তরাজ্যে খুঁজে পাননি।কুতুবের ভাষায়, “এমন কিছু প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু যুক্তরাজ্যে খুঁজে পাইনি। তাই দেশে ফিরে সেগুলো আবিষ্কার করতে চাই।”
বাংলাদেশের বনভূমি, আর্দ্র পরিবেশ ও পচা কাঠের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জীবের বৈচিত্র্য তাঁর কাছে নতুন অনুসন্ধানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রকৃতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুনভাবে তুলে ধরতে চান তিনি।
অদেখাকে দেখার আনন্দ
কুতুব উদ্দিনের সাফল্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি ধৈর্য, কৌতূহল ও নিজের ভালোবাসার কাজকে গভীরভাবে অনুসরণ করার গল্প। যে ক্ষুদ্র জীবগুলো প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য থেকে যায়, সেগুলোকেই তিনি তুলে ধরছেন নতুন সৌন্দর্য ও তাৎপর্য নিয়ে। তাঁর ক্যামেরায় পচা কাঠ হয়ে ওঠে বিস্ময়ের মঞ্চ, ক্ষুদ্র জীব হয়ে ওঠে শিল্পের বিষয়, আর পরিচিত বনভূমি রূপ নেয় অজানা এক জগতে। এই কাজ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে সব সময় দূর দেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো একটু নিচু হয়ে তাকালেই চোখের সামনে খুলে যেতে পারে এক বিস্ময়কর পৃথিবী।
আর সেই পৃথিবীর গল্পই নিজের ক্যামেরায় ধরে রেখে চলেছেন কুতুব উদ্দিন—একটি ক্ষুদ্র জীব থেকে আরেকটি অজানা জীবের সন্ধানে।



