কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প: ৯০ শতাংশ আবাসনে নেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত ঘিরে কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। কিন্তু পর্যটকদের থাকার এসব স্থাপনার বড় অংশেই নেই প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। ইনানীর একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর পর সামনে এসেছে পর্যটননগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা।
নীল সমুদ্র, বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা আর পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর কক্সবাজারে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। তাঁদের আবাসন ও বিনোদনের চাহিদা মেটাতে শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর ব্যবসা। কিন্তু পর্যটনশিল্পের এই সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কি নিশ্চিত হয়েছে ভবনগুলোর নিরাপত্তা?
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন কিংবা পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। অনেক স্থাপনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সও অনুপস্থিত। ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
অনুমোদন ছাড়াই চলছে বহু আবাসন প্রতিষ্ঠান
কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে লাবণী সৈকত পর্যন্ত মাত্র এক-দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাতেই গড়ে উঠেছে চার শতাধিক বহুতল ভবন। ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পুরো শহরে বহুতল ভবনের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে, শহরের বাইরে রামুর পেচারদ্বীপ, উখিয়ার ইনানী এবং মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন এলাকাতেও বাড়ছে পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনা।
নিয়ম অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের আগে অনুমোদিত নকশা, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নিরাপদ অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু স্থানীয় পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছে।
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলা ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে সহস্রাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে।
ইনানীর অগ্নিকাণ্ডে সামনে এল নিরাপত্তার ঘাটতি
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের এই এলাকায় কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের কারণে এসব স্থাপনা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও অনেকগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং জেলা প্রশাসনের ব্যবসায়িক অনুমোদনও নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণ দিয়ে নির্মিত স্থাপনায় আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পর্যাপ্ত বহির্গমনপথ, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা না থাকলে এমন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সরু রাস্তা বাড়াচ্ছে বিপদের আশঙ্কা
কক্সবাজারের ঝুঁকি শুধু হোটেল-মোটেল বা রিসোর্টেই সীমাবদ্ধ নয়। শহরের টেকপাড়া, নুরপাড়া, পেশকারপাড়া, ঝাউতলা, নতুন বাহারছড়া, বাহারছড়া, রুমালিয়ারছড়া, পাহাড়তলী, বইল্ল্যাপাড়া, ঘোনারপাড়া ও লাইট হাউস পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবন গড়ে উঠেছে। এসব এলাকার অনেক ভবনের সামনে রয়েছে মাত্র কয়েক ফুট প্রশস্ত রাস্তা। কোথাও কোথাও রিকশা চলাচল করাও কঠিন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জলাশয় না থাকায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য পানির উৎসের সংকট দেখা দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো ভবনে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, উদ্ধারকাজ পরিচালনা এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি ভবনের আগুন দ্রুত আশপাশের স্থাপনাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফায়ার লাইসেন্সের সংখ্যা কমছে
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মাত্র ৫০টি হোটেল তাদের ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে। আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। এর আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এ কারণে অধিকাংশ হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
লাইসেন্স নবায়নের এই চিত্র পর্যটননগরীর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে লাইসেন্সের সংখ্যা দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত নিরাপত্তার অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না; এজন্য প্রয়োজন সরেজমিন পরিদর্শন এবং নিরাপত্তার মান যাচাই।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরোধক দরজা নেই, স্মোক ডিটেক্টর অকার্যকর, ফায়ার এক্সটিংগুইশার অপর্যাপ্ত কিংবা ভবনের আয়তন অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নেই, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের চূড়ান্ত সনদ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অনুমোদন যাচাইয়ে কউকের উদ্যোগ
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন জানান, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় কয়েকশ প্রতিষ্ঠান থাকায় সেগুলোর অনুমোদন যাচাই করতে সময় লাগছে। ইতিমধ্যে যাচাই করা আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে বৈধতা নিশ্চিত করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষ হলে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানও অধিকাংশ হোটেল, গেস্ট হাউস, রিসোর্ট ও কটেজের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পর্যটনের বিকাশে নিরাপত্তাই হোক অগ্রাধিকার
কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই শিল্পের সম্প্রসারণ যদি নিরাপদ অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর প্রশাসনিক তদারকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে পর্যটকদের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি বাড়বে।
প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিশ্চিত করা, ভবনের অনুমোদিত নকশা যাচাই, নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন, জরুরি বহির্গমনপথ সচল রাখা এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সরু সড়ক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে উদ্ধারব্যবস্থা উন্নত করাও জরুরি।
ইনানীর মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের তৎপরতা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। পর্যটননগরী কক্সবাজারকে নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু দুর্ঘটনার পর অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। পর্যটনের সৌন্দর্য ও সাফল্য তখনই টেকসই হবে, যখন সেখানে বেড়াতে আসা মানুষের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।



