নবজাতকের মুখে পরিপাটি গোঁফ! ফাঁস হলো ডিজিটাল জালিয়াতির রহস্য

সদ্যোজাত এক শিশুর মুখে পরিপাটি করে ছাঁটা ঘন কালো গোঁফ—এমনই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও হাসির রোল। ইকুয়েডরের বলে দাবি করা ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, হাসপাতালের বিছানায় থাকা নবজাতকটির ওপরের ঠোঁট এবং গালের কিছু অংশে স্পষ্ট কালো লোম রয়েছে, যা দেখতে অবিকল পূর্ণবয়স্ক পুরুষের গোঁফের মতো। ভিডিওটি মুহূর্তেই নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে কোটি মানুষের নজর কাড়লেও প্রশ্ন উঠেছে—চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এমন ঘটনা কি আদৌ সম্ভব, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ডিজিটাল কারসাজি?
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা হাস্যরসে মেতে ওঠেন। শিশুটির অবয়ব দেখে নেটিজেনরা মন্তব্য করতে থাকেন, প্রথম পা ফেলার আগেই শিশুটি যেন জীবনের ‘মিড-লাইফ ক্রাইসিসে’ (মধ্যবয়সের সংকটে) পড়েছে।
একজন ব্যবহারকারী রসিকতা করে লেখেন, ‘ছেলেটি কিন্ডারগার্টেন বাদ দিয়ে সরাসরি জীবনের মধ্যবয়সী হতাশায় ঢুকে পড়েছে।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘সে জন্মই নিয়েছে তিন সন্তানের বাবা হয়ে, সঙ্গে দুটি হোম লোন এবং অবসরের প্রস্তুতি নিয়ে।’
অন্য এক মন্তব্যে বলা হয়, ‘বয়স মাত্র দুই ঘণ্টা, কিন্তু তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ৯টা-৫টার করপোরেট চাকরি করতে করতে সে এখনই ক্লান্ত।’
শুধু মন্তব্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি; সামাজিক মাধ্যমে শিশুটির ছবি নিয়ে শুরু হয় একের পর এক ব্যঙ্গাত্মক ‘ফটো এডিট’। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি সম্পাদিত ছবিতে দেখা যায়, শিশুটি কাঁধে সোনালি পাড়ের সামরিক পোশাক ও মেডেল পরে ‘সুপ্রিম লিডার’ নামফলক লাগানো এক টেবিলের পেছনে বসে আছে, পেছনে উত্তর কোরিয়ার পতাকা এবং স্লোগান লেখা ‘ছোট হাত, বড় পরিকল্পনা’। আরেকটি ছবিতে তাকে করপোরেট ব্লেজার পরিয়ে মুখে চুরুট ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে; অন্য একটি ছবিতে ভিডিও গেমের জনপ্রিয় চরিত্র ‘মারিও’র লাল টুপি ও ওভারঅল পোশাকে সাজানো হয়েছে। এমনকি মেটালিক হেলমেট ও বর্ম পরিয়ে প্রাচীন হান যোদ্ধার রূপেও তাকে উপস্থাপন করা হয়।
তবে হাসির জোয়ার ছাপিয়ে প্রশ্ন উঠেছে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে—একটি নবজাতকের কি সত্যিই এমন গোঁফ গজাতে পারে? চিকিৎসকদের মতে, মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশের সময় কিছু শিশুর শরীরে ‘ল্যানুগো’ (Lanugo) নামের অতি সূক্ষ্ম ও নরম লোম তৈরি হয়, যা সাধারণত জন্মের আগেই কিংবা জন্মের পর প্রাকৃতিকভাবেই ঝরে যায়। অনেক সময় শিশু পিঠ, কাঁধ, কান কিংবা মুখে এই ধরনের পাতলা লোমের ছাপ নিয়ে জন্ম নিতে পারে। তবে ল্যানুগো অত্যন্ত পাতলা, বিবর্ণ ও হালকা রঙের হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের মতো এমন ঘন, সুবিন্যস্ত ও গাঢ় কালো গোঁফ কোনোভাবেই ল্যানুগো হতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো নথিতেও এই ভিডিওর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এমন ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।
ভিডিওটির সত্যতা বিশ্লেষণ করে সাইবার ও ভিডিও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এটি স্পষ্টতই ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন বা ভিডিও সম্পাদনার কারসাজি। গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শিশুটির মাথা ও মুখমণ্ডলের নড়াচড়ার সঙ্গে গোঁফটি স্বাভাবিকভাবে সরছে না; শিশুর মুখের প্রতিটি নড়াচড়ার সময় গোঁফের অংশে সূক্ষ্ম ‘গ্লিচ’ বা ফ্রেমের কাঁপুনি ধরা পড়ে। এ ছাড়া হাসপাতালের কক্ষের স্বাভাবিক আলো-ছায়া ও শিশুর গায়ের চামড়ার উজ্জ্বলতার সঙ্গে কৃত্রিমভাবে বসানো ওই কালো গোঁফের আলোর কোনো মিল নেই।
ভিডিওটি যে হাসপাতালের দাবি করা হচ্ছে, সেই হাসপাতালের কোনো স্বীকৃতি, চিকিৎসকের বক্তব্য, শিশুর পরিবারের পরিচয় কিংবা কোনো মেডিকেল রেকর্ডের অস্তিত্বও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের ধারণা, হাসপাতালে শুয়ে থাকা এক সাধারণ নবজাতকের আসল ভিডিওতে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ফিল্টার কিংবা ডিজিটাল ফেস-ম্যাপিং টুলের সাহায্যে ইচ্ছাকৃতভাবে গোঁফটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, কেবল ইন্টারনেটে ভাইরাল করার উদ্দেশ্যে।



