২৫ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ৯ কার্তিক ১৪৩৩
বিশ্ব

মা-ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আজ নিজের ‘গাড়ি’ চালিয়ে বেড়ায় ছোট্ট ভেড়া কিকি!

37uEAhTLpms0zBnWROBT4sBJQfPKD4Djm2NYHiOqwP5wN2-s9fwp5IkTty70xS1hod8zw9uKWViFwfkaDr_G01KxrtpH27iwsqYvTfT9RLyon2JSYt6sYfSzaQIccE3ghF5eeJnkyAeaAw_KUn704pRPLj4VealSL-c0ki57OfJT06OQzBkkJVCjxaWQ55Ij

জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা থামাতে পারেনি কৌতূহলী কিকিকে। মাথা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে মোটরচালিত হুইলচেয়ার, নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ায় খামারজুড়ে। তার গল্প ছুঁয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়।

চলাফেরার স্বাধীনতা সবার কাছেই আনন্দের। কিন্তু জন্ম থেকেই যদি স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে সেই আনন্দের পথ তৈরি করতে প্রয়োজন হয় বিশেষ যত্ন ও সহায়তার। যুক্তরাষ্ট্রের ছোট্ট ভেড়া কিকির জীবন যেন সেই কথারই এক মিষ্টি উদাহরণ। চার পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারে না সে। জন্মের পর মায়ের কাছ থেকেও পায়নি প্রত্যাশিত সাড়া। অথচ আজ নিজের মোটরচালিত হুইলচেয়ার চালিয়ে খামারজুড়ে ঘুরে বেড়ায় কিকি। তার বাহনটির নামও বেশ মজার—‘ল্যাম্বরগিনি’!

ম্যাসাচুসেটসের একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে বেড়ে ওঠা কিকির গল্প এখন প্রাণীপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তার কৌতূহল, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং নিজের মতো করে চলাফেরা করার আনন্দ মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে।

জন্ম থেকেই ছিল কঠিন লড়াই

কিকির জীবনের শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। জন্মগত শারীরিক সমস্যার কারণে তার পক্ষে চার পায়ে ভর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা সম্ভব ছিল না। জন্মের পর তার মা তাকে দুধ খাওয়াতেও অস্বীকার করে। ফলে জীবনের একেবারে শুরুতেই কিকির প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিশেষ যত্ন ও নিরাপদ আশ্রয়ের। মাত্র ১১ দিন বয়সে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের একটি প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রে। সেখানে পরিচর্যাকারীরা তার খাবার, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন যত্নের দায়িত্ব নেন।

অন্য ভেড়ার বাচ্চাদের মতো দৌড়ে বেড়ানো কিংবা চার পায়ে ভর দিয়ে ঘুরে বেড়ানো কিকির জন্য সহজ ছিল না। তবে তার মধ্যে ছিল অন্য রকম এক প্রাণচাঞ্চল্য। খেলনা, আশপাশের জিনিসপত্র এবং নতুন কিছু দেখার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। পরিচর্যাকারীরা বুঝতে পারেন, কিকি শুধু যত্ন নয়, নিজের পরিবেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে যোগাযোগ করারও সুযোগ চায়।

Advertisements

কৌতূহল থেকেই ‘ল্যাম্বরগিনি’র জন্ম

কিকির চলাফেরার সীমাবদ্ধতা দূর করতে পরিচর্যাকারীরা এমন একটি ব্যবস্থা খুঁজছিলেন, যার সাহায্যে সে নিজের ইচ্ছায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারবে। প্রচলিত সহায়ক সরঞ্জামের বদলে তার স্বভাব ও সক্ষমতার সঙ্গে মানানসই একটি সমাধান তৈরি করার কথা ভাবেন তাঁরা। কিকি মাথা দিয়ে বিভিন্ন জিনিস ঠেলতে পারে—এই বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। সেই ক্ষমতাকেই কাজে লাগানো হয় মোটরচালিত হুইলচেয়ার ব্যবহারের পরিকল্পনায়। বিশেষভাবে উপযোগী করে তৈরি করা হয় হুইলচেয়ারটির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সামনে বসানো জয়স্টিক মাথা বা থুতনি দিয়ে ঠেলে কিকি নিজের চলার দিক ও গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

নতুন বাহনটির নাম রাখা হয় ‘ল্যাম্বরগিনি’। নামের সঙ্গে মিল রেখে তার চলাফেরার ভঙ্গিতেও যেন রয়েছে একরাশ আত্মবিশ্বাস!

প্রথমে নতুন যন্ত্রটি ব্যবহার করার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়েছে কিকিকে। তবে নিজের চারপাশ ঘুরে দেখার আগ্রহ তাকে দ্রুতই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে সে বুঝে যায়, কীভাবে জয়স্টিক ঠেলে সামনে এগোতে হয় এবং কীভাবে দিক পরিবর্তন করতে হয়। এভাবেই একটি সহায়ক যন্ত্র কিকির কাছে হয়ে ওঠে স্বাধীনভাবে চলাফেরার নতুন মাধ্যম।

এখন খামারজুড়ে তার রাজত্ব

নিজের ‘ল্যাম্বরগিনি’ চালিয়ে কিকি এখন খামারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। আশপাশের পরিবেশ দেখতে, নতুন জায়গায় যেতে কিংবা পরিচিত মানুষদের কাছে পৌঁছাতে তার আর আগের মতো অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। কখনো সে এত দূরে চলে যায় যে পরিচর্যাকারীদের তাকে থামানোর জন্য বেশ চেষ্টা করতে হয়! তার এই দুরন্ত স্বভাবই কিকির গল্পকে আরও মজার করে তুলেছে।

যে প্রাণীটির জন্য একসময় প্রতিটি চলাফেরাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সে-ই এখন নিজের বাহন নিয়ে চারপাশ ঘুরে দেখার আনন্দ উপভোগ করছে। তার এই পরিবর্তন শুধু একটি প্রাণীর জীবনযাত্রার উন্নতির গল্প নয়; এটি দেখায়, উপযুক্ত সহায়তা পেলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নতুনভাবে সক্ষম হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা যায়। কিকির কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে পরিচর্যাকারীরাও নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেন, কোনো প্রাণীর সক্ষমতা বিচার করার সময় শুধু তার সীমাবদ্ধতার দিকে তাকালে চলে না। তার আগ্রহ, শেখার ক্ষমতা এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হয়।

ছোট্ট কিকি, বড় এক শিক্ষা

কিকির গল্প বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও মানুষের জীবন নিয়েও নতুন করে ভাবতে শেখায়। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাউকে সব সময় অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। উপযুক্ত প্রযুক্তি, সহায়ক পরিবেশ এবং ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

অবশ্য কিকির অভিজ্ঞতা মানুষের প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। তবু তার গল্প থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: সাহায্য করার অর্থ শুধু কারও যত্ন নেওয়া নয়, বরং তাকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ করে দেওয়াও। কিকির জন্য মোটরচালিত হুইলচেয়ারটি তাই কেবল একটি বাহন নয়। এটি তার চারপাশের পৃথিবীকে আরও স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ। আর এই সুযোগ তৈরি হয়েছে পরিচর্যাকারীদের মনোযোগ, ধৈর্য ও সৃজনশীলতার কারণে।

সহমর্মিতাই বদলে দিতে পারে জীবন

প্রাণীটির গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন। ছোট্ট একটি ভেড়া কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে পারে, তা মানুষের মনে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করছে।

তবে কিকির গল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক শুধু তার মোটরচালিত হুইলচেয়ার চালানোর দৃশ্য নয়। বরং তার প্রয়োজন বুঝে পরিচর্যাকারীদের সমাধান খুঁজে বের করার মানসিকতা। তাঁরা কিকিকে অন্য ভেড়ার মতো চলতে বাধ্য করেননি; বরং তার জন্য চলাফেরার একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছেন। আমাদের চারপাশেও এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং উপযুক্ত সুযোগ ও সহায়তার অভাব তাঁদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। তাঁদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, চলাচল ও অংশগ্রহণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা এবং তাঁদের সক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখা—এসবই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিকি হয়তো মানুষের ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু তার ‘ল্যাম্বরগিনি’ চালিয়ে খামারজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য যেন একটি সহজ বার্তা দেয়—প্রতিটি জীবেরই নিজের মতো করে পৃথিবীকে আবিষ্কার করার অধিকার আছে।

চার পায়ে হাঁটতে না পারলেও কিকির আনন্দ থেমে থাকেনি। নিজের ছোট্ট বাহনে চড়ে সে এগিয়ে চলেছে নতুন অভিজ্ঞতার দিকে। আর সেই পথচলায় সে মনে করিয়ে দিচ্ছে, সীমাবদ্ধতা থাকা মানেই সম্ভাবনার শেষ নয়; কখনো কখনো একটু সহমর্মিতা, সঠিক সহায়তা আর নতুন করে ভাবার সাহসই খুলে দিতে পারে স্বাধীনতার দরজা।

Advertisements