২৫ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ৯ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

নেতিবাচক চিন্তা থামছে না? বেরিয়ে আসুন এই সহজ উপায়ে

WhatsApp Image 2026-10-25 at 7.41.19 PM

মন খারাপ হলে একই ঘটনা বারবার মনে পড়ে। কেন এমন হলো, কোথায় ভুল ছিল, পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত কি না—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মাথায়। অনেক সময় মনে হয়, সমস্যার প্রতিটি দিক বুঝে ফেলতে পারলেই হয়তো মন হালকা হবে। অথচ অতিরিক্ত চিন্তা অনেক ক্ষেত্রে স্বস্তি দেওয়ার বদলে মানসিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তোলে। এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে, মন ভালো হওয়ার অপেক্ষা না করে ছোট্ট কোনো কাজ শুরু করা।

মনোবিজ্ঞানে এ পদ্ধতির নাম ‘বিহেভিয়ারাল অ্যাকটিভেশন’ বা আচরণগত সক্রিয়তা। এর মূল ধারণা হলো, কাজ করার জন্য সব সময় ভালো লাগার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজ শুরু করার মধ্য দিয়েও মনের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে।

বারবার একই চিন্তা কেন ঘুরে ফিরে আসে?

কোনো কষ্টদায়ক ঘটনা নিয়ে ভাবা অস্বাভাবিক নয়। বরং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু যখন একই ঘটনা, ব্যর্থতা কিংবা দুশ্চিন্তা নিয়ে কোনো সমাধানে পৌঁছানো ছাড়াই বারবার ভাবতে থাকা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘রুমিনেশন’। এ ধরনের চিন্তার চক্রে আটকে গেলে মানুষ প্রায়ই বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে অতীতের ভুল কিংবা ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে প্রয়োজনীয় কাজেও মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। মন খারাপের কারণে কাজ এড়িয়ে চলা, আবার কাজ জমে যাওয়ায় আরও বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগা—এভাবে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়।
২০২০ সালে ‘বিহেভিয়ার রিসার্চ অ্যান্ড থেরাপি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় পুনরাবৃত্ত নেতিবাচক চিন্তার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক আবেগ এবং দৈনন্দিন সমস্যা মোকাবিলার অসুবিধার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়।

মন ভালো করার অপেক্ষায় নয়, শুরু হোক ছোট পদক্ষেপ

নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভাঙতে সব সময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। বরং এমন কিছু কাজ বেছে নেওয়া যেতে পারে, যা অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। যেমন, কয়েক মিনিট হাঁটা, গোসল করা, ঘর গোছানো, পছন্দের গান শোনা কিংবা দীর্ঘদিন উত্তর না দেওয়া কোনো বার্তার জবাব দেওয়া।
আচরণগত সক্রিয়তার লক্ষ্য হলো নিষ্ক্রিয়তা কমিয়ে মানুষকে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন কাজে ফিরিয়ে আনা। কাজগুলো ছোট হলেও সেগুলো সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণবোধ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি মনোযোগ একই চিন্তার মধ্যে আটকে থাকার বদলে বর্তমান কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।

Advertisements

২০২১ সালে ‘সাইকোলজিক্যাল মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণেও বিষণ্নতার উপসর্গ কমাতে আচরণগত সক্রিয়তার কার্যকারিতার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, একটি ছোট কাজ করলেই সব ধরনের মানসিক কষ্ট দূর হয়ে যাবে। বরং এটি ধীরে ধীরে ভালো থাকার অভ্যাস গড়ে তোলার একটি উপায়।

নিজের সমস্যাকে দেখুন অন্য দৃষ্টিতে

নেতিবাচক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে সমস্যাটি নিয়ে কীভাবে ভাবছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি না করে বরং নিজের কাছে জানতে চান—ঠিক কোন বিষয়টি আমাকে কষ্ট দিচ্ছে? এর কোন অংশটি আমার নিয়ন্ত্রণে আছে? পরিস্থিতি সামলাতে এখন আমার পক্ষে কী করা সম্ভব?

আরেকটি কার্যকর কৌশল হলো, নিজের পরিস্থিতিকে কিছুটা দূর থেকে দেখার চেষ্টা করা। ধরুন, আপনার কোনো বন্ধু একই সমস্যায় পড়েছেন। তাঁকে আপনি কী পরামর্শ দিতেন? নিজের ক্ষেত্রেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করলে আবেগের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হতে পারে।
তবে আত্মবিশ্লেষণ এবং অতিরিক্ত চিন্তার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আত্মবিশ্লেষণ মানুষকে কোনো উপলব্ধি বা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, একই চিন্তা বারবার ফিরে এলেও যখন নতুন কোনো সমাধান পাওয়া যায় না, তখন কিছুক্ষণের জন্য চিন্তা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

প্রথম পদক্ষেপই হতে পারে পরিবর্তনের শুরু

মন খারাপের সময় কোনো কাজ করতে ইচ্ছা না করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ইচ্ছা ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রতিটি কাজ পিছিয়ে দিলে নিষ্ক্রিয়তা আরও দীর্ঘ হতে পারে। তাই নিজেকে একসঙ্গে সবকিছু ঠিক করার চাপ না দিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য একটি সহজ কাজ শুরু করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, ভালো থাকার জন্য প্রতিদিন সমান উদ্যম থাকা জরুরি নয়। কোনো দিন অল্প কিছু করাও অগ্রগতি। আর ছোট পদক্ষেপের উদ্দেশ্য সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং সমস্যা মোকাবিলার মতো মানসিক অবস্থা তৈরির সুযোগ করে দেওয়া।

যদি নেতিবাচক চিন্তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে কিংবা ঘুম, খাওয়া ও স্বাভাবিক কাজকর্মে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত। কারণ, সব সমস্যার সমাধান একা নিজের চেষ্টায় সম্ভব নয়।

সবশেষে, মন ভালো হওয়ার জন্য সব সময় পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো পরিবর্তনের শুরু হয় নিজের ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত থেকে—চিন্তার ভেতর আটকে না থেকে উঠে দাঁড়ানো, জানালা খুলে দেওয়া কিংবা কয়েক মিনিট হাঁটতে বেরিয়ে পড়া। কাজটি যত ছোটই হোক, সেটিই হতে পারে নেতিবাচক চিন্তার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ।

Advertisements