ডিভাইস আসক্তি কমাতে খেলাধুলায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও অনলাইন গেমের প্রতি শিশু-কিশোরদের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণের এই সময়ে তাদের মাঠমুখী করতে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার চর্চা বাড়ানো, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসর।
এবারের প্রতিযোগিতায় অনলাইনে নিবন্ধন করেছে ১৬ লাখ ২৩ হাজার প্রতিযোগী। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ ক্রীড়াবিদ প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তাঁর মতে, খেলাধুলার প্রসারের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের ডিভাইসনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি সুস্থ জাতি গঠন ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২৫ অক্টোবর রোববার দুপুরে খুলনা জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণ
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর এবারের আসরকে তৃণমূল পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে সরকার। প্রতিযোগিতাটি দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে দল গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে। এরপর ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা পেরিয়ে নির্বাচিত খেলোয়াড়েরা জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রথম আসরে নিবন্ধিত প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার। দ্বিতীয় আসরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ২৩ হাজারে। আগামী ৫ নভেম্বর খুলনা জেলা স্টেডিয়াম থেকে প্রধানমন্ত্রী একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করবেন। আগামী বছরের মে বা জুনে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্ব শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিবন্ধনের এই বৃদ্ধি শিশু-কিশোরদের মধ্যে খেলাধুলা নিয়ে আগ্রহের ব্যাপ্তি তুলে ধরছে। তবে এই আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া উন্নয়নে রূপ দিতে হলে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচ, উপযুক্ত মাঠ এবং খেলোয়াড়দের ধারাবাহিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিযোগিতা পেরিয়ে স্থায়ী প্রশিক্ষণের সুযোগ
প্রতিভা খুঁজে বের করাই শেষ লক্ষ্য নয়; সেই প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর প্রথম আসরে উঠে আসা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ৪০ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
আমিনুল হক জানান, প্রশিক্ষণ শেষে বাছাই করা খেলোয়াড়দের স্থায়ীভাবে বিকেএসপিতে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার যাবতীয় দায়িত্ব সরকার বহন করবে, যাতে আর্থিক কিংবা অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়েরা মাঝপথে ঝরে না পড়ে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এমন অনেক শিশু-কিশোরের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যাদের প্রতিভা থাকলেও উন্নত প্রশিক্ষণ বা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।
ডিভাইসনির্ভরতা কমাতে খেলাধুলার ভূমিকা
শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বেড়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিনোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শারীরিক কার্যক্রম ও সরাসরি সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে খেলাধুলা হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প। মাঠে নিয়মিত খেললে শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ে, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে এবং সহনশীলতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের মতো গুণ বিকশিত হয়। পাশাপাশি সমবয়সীদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশার সুযোগ তৈরি হয়। তবে ডিভাইসের ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন যথেষ্ট নয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ, বিদ্যালয়ভিত্তিক ক্রীড়া কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলাকে নিয়মিত জীবনচর্চার অংশ করে তুলতে পারলেই এ ধরনের উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, খেলাধুলার মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন এনে সুস্থ জাতি ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায় সরকার। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে ও গুরুত্ব
খেলোয়াড় তৈরির জন্য প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত ক্রীড়া অবকাঠামো। খুলনা জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে প্রতিমন্ত্রী জানান, স্টেডিয়ামটির গ্যালারির অর্ধেকের বেশি অংশ নেই। এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়ামে রূপ দিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই গ্যালারি নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়াম ও মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সও পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সটির অবস্থা জরাজীর্ণ। এসব ক্রীড়া স্থাপনার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। অবকাঠামোর উন্নয়ন বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে আরও বেশি খেলোয়াড় নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবেন।
প্রতিভা থেকে সম্ভাবনা, সম্ভাবনা থেকে সাফল্য
খুলনা জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনের সময় জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, জেলা পরিষদের প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা, ক্রীড়া সংগঠক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসরে বিপুলসংখ্যক নিবন্ধন দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে খেলাধুলার সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই অংশগ্রহণকে কীভাবে নিয়মিত অনুশীলন, দক্ষ খেলোয়াড় তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দেওয়া যায়। খেলাধুলা কেবল পদক জয়ের মাধ্যম নয়; এটি শারীরিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মাঠ, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানো গেলে তৃণমূলের প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে শিশুদের জীবন থেকে ডিভাইসকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে খেলাধুলা ও বাস্তব জীবনের কার্যক্রমের ভারসাম্য তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভারসাম্য গড়ে তোলার পথে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নির্ভর করবে উদ্যোগটির ধারাবাহিকতা, প্রশিক্ষণের মান এবং মাঠপর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর।



