জিম ছাড়াই শরীরচর্চা, জেনে নিন ‘৩-৩-৩’ হাঁটার কৌশল

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত হাঁটার বিকল্প নেই। তবে প্রতিদিন একই গতিতে হাঁটার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময় পরপর হাঁটার গতি পরিবর্তন করলে ব্যায়ামের ধরনে ভিন্নতা আনা যায়। এ ধরনের একটি পদ্ধতি হলো ‘ইন্টারভাল ওয়াকিং ট্রেনিং’, যা পর্যায়ক্রমে ধীর ও দ্রুতগতিতে হাঁটার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। এর একটি প্রচলিত রূপ ‘৩-৩-৩’ হাঁটার পদ্ধতি নামে পরিচিত। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই হাঁটার একটি পরিকল্পিত রুটিন তৈরি করা সম্ভব।
জাপানে শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার বিভিন্ন অভ্যাসের মধ্যে নিয়মিত হাঁটা ও সক্রিয় জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রসঙ্গেই আলোচনায় এসেছে ধীর ও দ্রুতগতির হাঁটার এই কৌশল। পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে জিমে যাওয়ার বা বিশেষ কোনো ব্যায়ামের সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজন নেই। বাড়ির আশপাশের নিরাপদ রাস্তা, পার্ক কিংবা হাঁটার উপযোগী খোলা জায়গাতেই এটি করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু এই পদ্ধতি অনুসরণ করলেই পেটের মেদ কমবে বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওজন কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
‘নিউজ১৮’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই গতিতে দীর্ঘ সময় হাঁটার পরিবর্তে নির্দিষ্ট বিরতিতে গতি বাড়ানো ও কমানোর মাধ্যমে ব্যায়ামের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই পদ্ধতিতে শরীর কখনো তুলনামূলক কম, আবার কখনো বেশি পরিশ্রম করে। ফলে হাঁটার সময় হৃদ্স্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিতেও পরিবর্তন আসে। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শরীরের সহনশীলতা এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এটি সহায়ক হতে পারে।
‘৩-৩-৩’ পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, প্রথমে তিন মিনিট স্বাভাবিক বা আরামদায়ক গতিতে হাঁটতে হবে। এরপরের তিন মিনিট হাঁটার গতি বাড়িয়ে তুলনামূলক দ্রুত হাঁটতে হবে। এভাবে ধীরগতির তিন মিনিট ও দ্রুতগতির তিন মিনিট মিলিয়ে একটি ছয় মিনিটের চক্র তৈরি হবে। এই চক্র পরপর তিনবার সম্পন্ন করলে মোট ১৮ মিনিটের একটি রুটিন তৈরি হয়।
দ্রুত হাঁটার সময় এমন গতি বেছে নেওয়া উচিত, যাতে শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা দ্রুত হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকে। একেবারে স্বাভাবিক কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে, তবে হাঁপিয়ে গিয়ে কথা বলাই অসম্ভব হয়ে পড়ার মতো গতি নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে যারা নতুন করে ব্যায়াম শুরু করছেন, তাঁদের প্রথম দিন থেকেই সর্বোচ্চ গতিতে হাঁটার চেষ্টা না করে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে গতি বাড়ানো উচিত।
এই পদ্ধতি অনুসরণের আগে কয়েক মিনিট স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে শরীরকে প্রস্তুত করে নেওয়া ভালো। এরপর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ধীর ও দ্রুতগতির হাঁটা চালিয়ে যেতে হবে। ১৮ মিনিটের মূল রুটিন শেষ হলে আবার কয়েক মিনিট ধীরগতিতে হেঁটে ব্যায়াম শেষ করা যেতে পারে। এতে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদ্স্পন্দন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ পায়। শারীরিক সক্ষমতা বাড়লে এবং শরীর ভালোভাবে মানিয়ে নিলে ধীরে ধীরে অনুশীলনের সময় বাড়ানো যেতে পারে।
হাঁটার গতি পরিবর্তন করার ফলে শরীরকে বিভিন্ন মাত্রার পরিশ্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। দ্রুতগতিতে হাঁটার সময় পায়ের পেশি বেশি সক্রিয় হয় এবং হৃদ্যন্ত্রকে তুলনামূলক বেশি কাজ করতে হয়। আবার ধীরগতিতে হাঁটার সময় শরীর কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায়। এভাবে হাঁটার তীব্রতা পরিবর্তন করলে নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি ক্যালোরি খরচের পরিমাণও হাঁটার গতি, সময়, শরীরের ওজন ও ব্যক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বাড়তে পারে।
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শরীরের মোট ক্যালোরি খরচ এবং খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করা ক্যালোরির মধ্যে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। শরীর যখন দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা কম ক্যালোরি পায়, তখন জমা শক্তি ব্যবহার করতে শুরু করে। নিয়মিত হাঁটা এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। তবে পেটের চর্বি আলাদাভাবে কমানোর কোনো নির্দিষ্ট হাঁটার কৌশল নেই। শরীরের সামগ্রিক চর্বি কমার সঙ্গে সঙ্গে পেটের মেদও কমতে পারে, যদিও এর গতি ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
দ্রুত ও ধীরগতির হাঁটার আরেকটি সুবিধা হলো, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যায়ামের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দৌড়ানোর তুলনায় দ্রুত হাঁটা অনেকের কাছে সহজ মনে হতে পারে। এতে দৌড়ানোর মতো উচ্চমাত্রার ধাক্কা এড়ানো সম্ভব হলেও হাঁটু, গোড়ালি ও অন্যান্য অস্থিসন্ধির ওপর চাপ একেবারে পড়ে না, এমন নয়। অতিরিক্ত ওজন, পুরোনো আঘাত কিংবা অস্থিসন্ধির সমস্যা থাকলে হাঁটার গতি ও সময় সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নিয়মিত হাঁটা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা, পায়ের পেশির কর্মক্ষমতা বাড়ানো এবং দৈনন্দিন কাজে শারীরিক সহনশীলতা উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উপকার পেতে ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মাঝে খুব দ্রুত হাঁটার চেয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করাই বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে হাঁটার সময় আরামদায়ক জুতা পরা, নিরাপদ পথ নির্বাচন করা এবং শরীরের সংকেতের দিকে খেয়াল রাখাও জরুরি।
শুধু ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমানো অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে খাবারের ধরন ও পরিমাণের দিকেও নজর দিতে হবে। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য এবং প্রয়োজনীয় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা ভালো। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, ভাজাপোড়া এবং বেশি ক্যালোরিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার প্রবণতা কমানো যেতে পারে।
তবে ওজন কমানোর জন্য সবার খাবার একসঙ্গে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। শরীরের বয়স, ওজন, উচ্চতা, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ঠিক করা উচিত। অতিরিক্ত কম খেলে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই দ্রুত ওজন কমানোর পরিবর্তে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি উপযোগী।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও ওজন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আগ্রহকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে অনেকে অতিরিক্ত খাওয়া বা শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকার অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েন। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পানি পান এবং অবসর সময়ে হাঁটা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কিংবা ধ্যানের মতো অভ্যাস উপকারী হতে পারে। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা ভালো।
যাঁরা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, তাঁরা শুরুতেই ১৮ মিনিটের দ্রুতগতির রুটিন অনুসরণ না করে অল্প সময় স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। পরে শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী দ্রুত হাঁটার সময় বাড়ানো যায়। হৃদ্রোগ, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ, ভারসাম্যজনিত সমস্যা কিংবা হাঁটু ও গোড়ালির গুরুতর অসুবিধা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হাঁটার সময় বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট হলে ব্যায়াম বন্ধ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, জাপানি ‘৩-৩-৩’ নামে পরিচিত ধীর ও দ্রুতগতির হাঁটার রুটিনটি দৈনন্দিন শরীরচর্চায় বৈচিত্র্য আনার একটি সহজ উপায় হতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সক্রিয় জীবনযাপনের সঙ্গে এই অভ্যাস যুক্ত করলে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা মিলতে পারে। তবে ফলাফল নির্ভর করবে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত অনুশীলনের ওপর।



