মুসলিমের জমিতে দুর্গাপূজা, ঢাক বাজান গ্রামের নারীরা

ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহমর্মিতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া পৌরসভার নয়নগঞ্জ গ্রাম। সেখানে একটি মুসলিম পরিবারের জমিতে গত ১৪ বছর ধরে উদযাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজা। পূজার আয়োজন থেকে শুরু করে প্রতিমা তৈরি, আলোকসজ্জা ও ঢাক বাজানো—বেশির ভাগ কাজই করেন গ্রামের নারীরা।
নয়নগঞ্জ গ্রামে প্রায় ৫৫টি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বসবাস। তবে গ্রামে কোনো স্থায়ী মন্দির না থাকায় একসময় সুভাষ শর্মা নামের এক ব্যক্তির জমিতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। পরে প্রায় ১৪ বছর আগে ১৫ শতক জমি কিনে নেন স্থানীয় হাজি ছানোয়ার সরকার। জমির মালিকানা পরিবর্তন হলেও পূজা আয়োজনের ক্ষেত্রে বাধা দেননি তিনি। বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে সেখানে পূজা করার অনুমতি দেন।
পাঁচ মাস আগে হাজি ছানোয়ার সরকার মারা গেলেও তার দেখানো সম্প্রীতির পথ ধরে রেখেছেন ছেলে আল আমিন সরকার। তিনি জানান, তার বাবা যেভাবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিও সেই আদর্শ অনুসরণ করছেন। তার জমিতে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের পাশাপাশি পূজার্থীদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।
এই দুর্গোৎসবের বিশেষত্ব হলো, আয়োজনের মূল দায়িত্ব পালন করেন গ্রামের নারীরা। ‘একতা নারী অঙ্গন’ নামের সংগঠনটি পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে। প্রতিমা তৈরি, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও ঢাক বাজানোর মতো কাজেও তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে। তবে পূজার মন্ত্রপাঠের দায়িত্ব পালন করেন পুরুষ পুরোহিত।
সংগঠনটির সভানেত্রী মাধবী রায় বলেন, প্রয়াত হাজি ছানোয়ার সরকার ছিলেন অত্যন্ত উদার মনের মানুষ। তার ছেলে আল আমিন সরকারও একইভাবে তাদের সহযোগিতা করছেন। তার মতে, নয়নগঞ্জ গ্রামের এই আয়োজন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের একটি সুন্দর উদাহরণ।
উল্লাপাড়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুজিত কুমার ঘোষ জানান, মুসলিম পরিবারের জমিতে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। জমি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারটি পূজার নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনেও সহযোগিতা করে আসছে। তার মতে, এই আয়োজন হিন্দু-মুসলিম সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উল্লাপাড়া পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়াও এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম পরিবারের জমিতে ‘একতা নারী অঙ্গন’-এর দুর্গাপূজা আয়োজন ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত নারীদের সংগঠন এবং সহযোগিতাকারী পরিবারকে তিনি অভিনন্দন জানান।
নয়নগঞ্জ গ্রামের এই আয়োজন দেখিয়ে দেয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। দীর্ঘ ১৪ বছরের এই ধারাবাহিকতা স্থানীয় মানুষের কাছে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সমকাল



