এক নোটিশেই চাকরি গেল ৭৩৯ জনের, কাঁদছেন ১৯ বছর ধরে কাজ করা শ্রমিকেরাও

গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কেয়া গ্রুপের চারটি পোশাক কারখানায় দ্বিতীয় দফায় আরও ৭৩৯ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কারখানার প্রধান ফটকে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের তালিকা টাঙিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার সকালে সেই তালিকা দেখতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক শ্রমিক। দুই দফায় প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরি হারানো কর্মীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে।
ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দফায় এসব কারখানা থেকে ছয় শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর করা নোটিশে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং জটিলতা, সময়মতো গ্যাস বিল পরিশোধ করতে না পারা এবং গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকায় উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে বিভিন্ন বিভাগ ও সেকশনের কিছু পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত শ্রমিক ও কর্মচারীদের ছাঁটাই কার্যকর করা হয়েছে।
ব্যাংকিং জটিলতা ও গ্যাস সংযোগ না থাকায় গত ৬ জুন থেকে কারখানাগুলোতে দফায় দফায় লে-অফ ঘোষণা করে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। টানা পাঁচবার লে-অফের মেয়াদ বাড়ানোর পর এবার গণছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর করল কর্তৃপক্ষ।
হঠাৎ চাকরি হারানোর খবরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বহু শ্রমিক। প্রায় ১৯ বছর ধরে কারখানাটিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন আবেদা বেগম। ছাঁটাইয়ের তালিকায় নিজের নাম দেখে কারখানার ফটকের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবেদা বলেন, ‘এত বছর চাকরি করে শেষপর্যন্ত খালি হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে।’
কারখানার সুইং সেকশনের অপারেটর ইয়াসমিন বেগমও চাকরি হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ১৮ বছর ধরে কাজ করা এই শ্রমিক বলেন, ‘চাকরি হারিয়ে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, সেটাই বুঝতে পারছি না।’
একই সেকশনের অপারেটর স্বপ্না বেগমও পরিবার চালানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, ১০ বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করা নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান বাজারে নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন। চাকরি না পেলে পরিবার চালাতে অটোরিকশা চালানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না বলে জানান তিনি।
এদিকে, এক নোটিশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, পাঁচবার লে-অফের পর একসঙ্গে এত শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা অন্যায্য। তিনি ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও আইনানুগ ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিশোধের দাবি জানান।
তবে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আইনগত পাওনা ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে নতুন করে কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে শ্রম আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বর্তমানে যেসব কর্মীর চাকরি বহাল রয়েছে, তারা লে-অফের আওতায় থাকবেন এবং আইন অনুযায়ী লে-অফ সুবিধা পাবেন।
ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানা এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। শিল্প পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত শিল্প পুলিশের পাশাপাশি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে।



