অ্যালোপেসিয়ার সঙ্গে লড়াই, কটূক্তি পেরিয়ে অন্যদের সাহস জোগাচ্ছেন লিলিয়া

শৈশবে চুলহীন মাথার কারণে বিদ্রূপের শিকার হয়েছেন, আত্মবিশ্বাসের অভাবে দীর্ঘদিন পরচুলার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সেই লিলিয়াই এখন অ্যালোপেসিয়ায় আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি শেখাচ্ছেন, চুল না থাকলেও জীবন থেমে থাকে না।
চুল মানুষের সৌন্দর্যের পরিচিত একটি অংশ। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মাথাভর্তি চুলকে ঘিরে সমাজের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ফলে কোনো নারী চুল হারালে তাঁকে শুধু শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে নয়, সামাজিক বিদ্রূপ, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন এবং মানসিক চাপের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়। রাশিয়ার লিলিয়া কুকুশকিনা-নুগমানোভার জীবন সেই বাস্তবতারই এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ। মাত্র কৈশোরে পা রাখার আগেই লিলিয়ার মাথার সব চুল ঝরে যায়। এরপর স্কুলজীবন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় পর্যন্ত তাঁকে নানা ধরনের অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। একসময় নিজের চেহারা নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তি ঢাকতে পরচুলাকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ভয় কাটিয়ে আজ তিনি চুল হারানো মানুষদের আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।
শৈশব থেকেই বিদ্রূপের শিকার
লিলিয়ার চুল হারানোর সমস্যাটির নাম অ্যালোপেসিয়া। এটি এমন একটি অবস্থা, যার কারণে মাথার চুল কিংবা শরীরের অন্য অংশের লোম ঝরে যেতে পারে। কারও ক্ষেত্রে অল্প কিছু চুল পড়ে, আবার কারও মাথার সব চুল, এমনকি ভ্রু ও চোখের পাপড়িও হারিয়ে যেতে পারে। শৈশবেই এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়ায় লিলিয়াকে স্কুলে সহপাঠীদের নানা বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়েছে। তাঁর মাথায় চুল না থাকায় অনেকে ধারণা করতেন, তিনি হয়তো ক্যানসারে আক্রান্ত। ফলে তাঁকে বারবার বোঝাতে হতো, তাঁর ক্যানসার হয়নি, তিনি মৃত্যুপথযাত্রী নন এবং তাঁর এই অবস্থা ছোঁয়াচেও নয়।
তবে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হয়েছিল ১৭ বছর বয়সে। স্কুলের কয়েকজন ছেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গ্রুপ তৈরি করে তাঁর চেহারা নিয়ে অবমাননাকর নাম ব্যবহার করেছিল। ঘটনাটি লিলিয়াকে গভীরভাবে আঘাত করে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের স্বাভাবিক রূপকে গ্রহণ করা সহজ ছিল না। অন্যদের মতো দেখতে না হওয়ার অনুভূতি তাঁকে দীর্ঘদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে রেখেছিল। ধীরে ধীরে অবশ্য তিনি বুঝতে শেখেন, অন্যের বিদ্রূপ তাঁর ব্যক্তিগত মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না।
পরচুলা ছিল আত্মরক্ষার ঢাল
দীর্ঘদিন লিলিয়ার কাছে পরচুলা ছিল নিজের চুলহীন মাথা আড়াল করার উপায়। এটি তাঁকে অন্যদের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি থেকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও স্বাভাবিক জীবনযাপনে নানা বাধা তৈরি করেছিল। পরচুলা খুলে পড়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি অনেক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। রোলার কোস্টারে চড়া, সাঁতার কাটা কিংবা ডাইভিংয়ের মতো কাজ এড়িয়ে চলতেন। এমনকি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাঁর মনে কাজ করত একই ধরনের উদ্বেগ।
লিলিয়ার উপলব্ধি, পরচুলা তাঁকে একদিকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল, অন্যদিকে নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতাও সীমিত করেছিল। বিশেষ করে কৈশোরের আনন্দময় সময়গুলোতে এই ভয় তাঁকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছে। পেছনের দিনগুলোর কথা মনে করে এখন তাঁর আফসোস হয়। তিনি মনে করেন, চুল কিংবা পরচুলা নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন না হয়ে যদি তখন জীবনের আনন্দগুলো উপভোগ করতে পারতেন, তাহলে হয়তো অনেক সুন্দর স্মৃতি তৈরি হতো।
পরচুলার আড়াল ছেড়ে নিজের পরিচয়ে
নিজেকে গ্রহণ করার পথে লিলিয়ার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে যখন তিনি নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরচুলা ছাড়া নিজের একটি ছবিও প্রকাশ করেন। ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ নিজেদের চুল হারানোর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি জানাতে শুরু করেন। এই প্রতিক্রিয়া তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি উপলব্ধি করেন, চুল পড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লড়াই করা মানুষ পৃথিবীতে একা নন। অনেকেই একই ধরনের ভয়, সংকোচ ও সামাজিক চাপের মধ্য দিয়ে জীবন কাটান।
তাঁর পরিচিতজনদের অনেকেই এর আগে তাঁকে পরচুলা ছাড়া দেখেননি। ফলে নিজের চেহারার এই দিকটি প্রকাশ করা ছিল তাঁর জন্য আত্মবিশ্বাস অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানোরও একটি পদক্ষেপ। বর্তমানে লিলিয়া মাঝেমধ্যে পরচুলা পরেন, তবে সেটি আর নিজের চেহারা আড়াল করার বাধ্যবাধকতা থেকে নয়; বরং ফ্যাশনের অংশ হিসেবে।
কটূক্তির বদলে দরকার সহমর্মিতা
চুলহীন মানুষদের নিয়ে মানুষের কৌতূহল কখনো কখনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। কেউ সরাসরি প্রশ্ন করেন, কেউ আবার না বুঝেই এমন মন্তব্য করেন, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
লিলিয়ার অভিজ্ঞতায়, শিশুদের কাছ থেকেও এমন প্রশ্ন এসেছে। একবার রাস্তায় একটি ছোট শিশু তাঁকে দেখে জানতে চেয়েছিল, তাঁর মাথায় চুল নেই কেন। শিশুটিকে বিষয়টি বোঝাতে গিয়ে লিলিয়া নিজের সঙ্গে লোমহীন বিড়ালের তুলনা করেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে শারীরিক বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক। কারও চুল আছে, কারও নেই—এ কারণে কেউ অন্যের চেয়ে ভালো বা খারাপ হয়ে যান না। তাই অ্যালোপেসিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং চুলহীন মানুষদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করা জরুরি। তিনি এটাও মনে করেন, মানুষের চেহারা নিয়ে বিদ্রূপ করার পরিবর্তে ইতিবাচক ও সম্মানজনক আচরণ করা উচিত। কারণ একটি মন্তব্যই কারও আত্মবিশ্বাসে বড় আঘাত হানতে পারে, বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তি ছোটবেলা থেকেই নিজের শারীরিক পরিবর্তন মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সহায়তার উদ্যোগ
একসময় যে সমস্যার কারণে লিলিয়াকে অপমান ও মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, আজ সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগাচ্ছে। তিনি অ্যালোপেসিয়ায় আক্রান্ত মানুষদের জন্য একটি অনলাইন সহায়তা গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। সেখানে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন, পরামর্শ পেতে পারেন এবং একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের কাছ থেকে মানসিক সমর্থন লাভ করতে পারেন। বিশেষ করে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের উদ্বেগ লিলিয়া বুঝতে পারেন। অনেক মা-বাবা আশঙ্কা করেন, চুল না থাকার কারণে তাঁদের সন্তান ভবিষ্যতে বিয়ে, কর্মজীবন কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই ভয় কখনো কখনো অভিভাবকদের এমন সব চিকিৎসাপদ্ধতির দিকে ঠেলে দেয়, যেগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে লিলিয়া মনে করেন, সন্তানকে চুল গজানোর জন্য যেকোনো পদ্ধতি ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিজের পরিবারও একসময় লেজার পদ্ধতি, মাথার ত্বকে বিভিন্ন প্রক্রিয়া এবং হরমোনের চিকিৎসাসহ নানা চেষ্টা করেছিল। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে সতর্ক করেছে। অ্যালোপেসিয়ার সব ধরনের জন্য কার্যকর ও স্থায়ী চিকিৎসা নেই। তবে এর ধরন ও কারণ অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে চুল পুনরায় গজাতে পারে। তাই কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন বা অবৈজ্ঞানিক দাবিতে বিশ্বাস না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সৌন্দর্যের চেয়ে বড় নিজের প্রতি ভালোবাসা
লিলিয়ার জীবনের গল্প কেবল চুল হারানোর অভিজ্ঞতা নয়; এটি আত্মপরিচয়, মানসিক শক্তি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার গল্পও। যে মানুষটি একসময় পরচুলা ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় পেতেন, তিনিই আজ অন্যদের নিজের স্বাভাবিক রূপকে গ্রহণ করার সাহস দিচ্ছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কাউকে ছোট করা বা তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা উচিত নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ নিজের চেহারা নিয়ে নিরাপদ বোধ করবেন এবং ভিন্নতার কারণে অপমানিত হবেন না।
চুল হারানো জীবনের একটি পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সেটি মানুষের পরিচয়, যোগ্যতা কিংবা ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। লিলিয়ার বার্তা তাই স্পষ্ট—নিজেকে আড়াল করে নয়, নিজের পরিচয়কে গ্রহণ করেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাঁচতে শেখা সম্ভব। আর সেই পথে একজন মানুষের সহমর্মিতা ও সমর্থনও অন্য কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



