‘বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করেছি’

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং ও ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড়—এই তিন পর্বের সমন্বয়ে হয় আয়রনম্যান প্রতিযোগিতা। গত মাসে ফ্রান্সে অর্ধদূরত্বের আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করার পর ৪ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানও শেষ করেছেন সাজিয়া সুলতানা।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে অনুশীলন, এরপর সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে অফিসে যাওয়া। দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে সংসার সামলানো, আর রাতে আবার ইনডোর ট্রেনিং। চাকরি, পরিবার ও খেলাধুলার মধ্যে এমন কঠিন সমন্বয় করেই নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়েছেন সাজিয়া সুলতানা। ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়স শ্রেণিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই নারী অ্যাথলেট ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন। তার দাবি, বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি। এর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ফ্রান্সে শেষ করেছিলেন আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। মাঝখানে ছিল না দীর্ঘ বিশ্রামের সুযোগ, বরং ছিল শরীর ও মনের সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা।
সাজিয়া সুলতানা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবি) জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত। আর দশজন কর্মজীবী নারীর মতোই তার দিন কাটে নানা দায়িত্বের মধ্যে। তবে সেই ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি নিজের জন্য তৈরি করেছেন এক ভিন্ন পরিচয়। তিনি এখন ট্রায়াথলন অ্যাথলেট। সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়ের সমন্বয়ে গঠিত এই খেলায় অংশ নিতে প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সময়ের কঠোর ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করা সহজ কোনো অর্জন নয়। এতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। সব মিলিয়ে দূরত্ব ২২৬ কিলোমিটার। সাজিয়া এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন ১৫ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে।

তবে তার এই সাফল্যের গল্প কেবল একটি প্রতিযোগিতা শেষ করার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুর্ঘটনা, ব্যথা, ক্লান্তি এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ কোরিয়ার গুর্যে কাউন্টিতে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সাইক্লিংয়ের প্রায় ৪০ কিলোমিটার অতিক্রম করার পর দুর্ঘটনার শিকার হন সাজিয়া। রাস্তা ছিল এবড়োখেবড়ো, কোথাও চড়াই, কোথাও উতরাই, আবার কোথাও বেশ সংকীর্ণ। এমনই একটি পথে তার সাইকেলের সামনের চাকা পিছলে যায়। মুহূর্তেই পড়ে যান তিনি। দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ভেঙে যায়, হাঁটু ও হাত থেকে রক্তক্ষরণ হয়। মাথায়ও আঘাত পান।
তার অবস্থা দেখে একজন স্বেচ্ছাসেবক এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে কাঁদতে শুরু করেন। তিনি সাজিয়াকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর সাজিয়া প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শরীরে আঘাত, সামনে দীর্ঘ পথ, তার পরও ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোর ইচ্ছা থেকে সরে আসেননি। শেষ পর্যন্ত সেই ইচ্ছাশক্তিই তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। তবে এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিলেও, গুরুতর আঘাত পেলে চিকিৎসা নেওয়া এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াও অত্যন্ত জরুরি।
এর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে, ১২ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের নিসে অনুষ্ঠিত আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করেন সাজিয়া। সেখানে তার সময় ছিল ৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ৭ সেকেন্ড। এই প্রতিযোগিতায় ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার সাঁতার, ৯০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ২১ দশমিক ১ কিলোমিটার দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। সাজিয়ার দাবি, নিসে এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করা প্রথম বাংলাদেশি নারী তিনি। ফ্রান্সের প্রতিযোগিতায় সাঁতার কাটতে হয়েছিল ভূমধ্যসাগরের উত্তাল পানিতে। সাইক্লিংয়ের পথে ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯০ ফুট উচ্চতার চড়াই। বিশেষ করে প্রথম ৩৬ কিলোমিটারের খাড়া পাহাড়ি পথ ও একের পর এক বিপজ্জনক বাঁক সামলানো তাঁর জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিযোগিতায়ও চ্যালেঞ্জের কমতি ছিল না। বরফশীতল পানিতে সাঁতার শেষ করে ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং করতে হয়েছে। এরপর শরীর যখন ক্লান্তিতে অবসন্ন, তখন শুরু হয়েছে ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটারের ম্যারাথন দৌড়। সাজিয়ার ভাষায়, প্রতিযোগিতায় শুধু শারীরিকভাবে ফিট থাকলেই হয় না। অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পরিস্থিতি বুঝে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুটি বড় প্রতিযোগিতায় অল্প সময়ের ব্যবধানে অংশ নিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, শরীর যখন থেমে যেতে চায়, তখন মনোবলই অনেক সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

সাজিয়ার খেলাধুলার যাত্রা অবশ্য পরিকল্পিতভাবে ট্রায়াথলন দিয়ে শুরু হয়নি। বরং অফিসের সহকর্মীদের খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকতে থাকতেই নিজের মধ্যে নতুন আগ্রহ খুঁজে পান তিনি। কর্মস্থলে পুরুষ সহকর্মীদের ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সংগঠক এবং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সহকর্মীদের মাঠে উৎসাহ দেওয়া, তাদের সাফল্যে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া ছিল তার কাজের বাইরের এক ভালো লাগার জায়গা। সহকর্মী ফারুক প্রায়ই নিজের দৌড়ের অভিজ্ঞতার কথা শোনাতেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একদিন তার দৌড় দেখতে গিয়ে সাজিয়ার মনে নিজেও খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ধীরে ধীরে সাঁতার ও সাইক্লিংয়ের অনুশীলন শুরু করেন সাজিয়া। অল্প সময়ের প্রস্তুতি নিয়েই ২০২৬ সালের জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতা তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। এরপর ট্রায়াথলনের দীর্ঘ প্রস্তুতিতে মনোযোগী হন। ১৭ মে চীনের সাংহাইয়ের চংমিং দ্বীপে আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতা শেষ করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেই পথ ধরে ফ্রান্সের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ এবং পরে দক্ষিণ কোরিয়ার পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করা তার খেলোয়াড়ি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে।
তবে খেলাধুলার এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল সময় বের করা। চাকরি, সংসার, সন্তানদের দেখাশোনা এবং অনুশীলন, সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়েছে তাকে। সাজিয়া জানান, শুরুতে কাজগুলো সমন্বয় করা কঠিন ছিল। খুব ভোরে উঠে সকাল ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত অনুশীলন করতেন। এরপর সন্তানদের স্কুলের প্রস্তুতি শেষ করে সরাসরি অফিসে চলে যেতেন। অফিস শেষে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বাসায় ফিরে পরিবারের দায়িত্ব সামলাতেন। রাত ১১টায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে আবার দুই ঘণ্টা সময় বের করে ইনডোর ট্রেনিং করতেন।

এই ব্যস্ততার মধ্যে পরিবারের সহযোগিতা ছিল তার বড় শক্তি। মা-বাবা ও স্বামীর সমর্থন ছাড়া এত দূর এগিয়ে আসা কঠিন হতো বলে মনে করেন তিনি। সন্তানদেরও নিজের অনুশীলনের অংশ করে নিয়েছেন সাজিয়া। কখনো তারা মায়ের সঙ্গে ইনডোর ট্রেনিং করত, কখনো গান ছেড়ে একসঙ্গে আনন্দ করতে করতেই অনুশীলন চলত। ছুটির দিনগুলোতে তুলনামূলক বেশি সময় রাখতেন প্রশিক্ষণের জন্য। অর্থাৎ, খেলাধুলার জন্য পরিবার ও চাকরি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি; বরং জীবনের বিভিন্ন দায়িত্বের সঙ্গে সমন্বয় করেই নিজের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছেন।
সাজিয়ার এই যাত্রায় বয়সও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়স শ্রেণিতে প্রতিযোগিতা করেন। অনেকের ধারণা, ত্রিশ বা চল্লিশের পর নতুন করে কোনো কঠিন খেলায় যুক্ত হওয়া কিংবা বড় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা কঠিন। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে চান তিনি। তার মতে, বয়স কোনো চূড়ান্ত বাধা নয়। বরং এই বয়সে মানুষের পরিকল্পনা, ধৈর্য ও নিজের প্রতি শৃঙ্খলা অনেক বেশি থাকতে পারে, যা দীর্ঘ দূরত্বের প্রতিযোগিতায় কাজে লাগে। অবশ্য বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের যত্ন, বিশ্রাম এবং প্রশিক্ষণের পরিকল্পনার দিকেও বাড়তি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
নিজের সাফল্যকে শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না সাজিয়া। তার লক্ষ্য, দেশের মেয়েদের মধ্যে সুস্থ জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। নারীরা যেন নিজেদের শরীর ও মনের সক্ষমতা বুঝতে পারেন, নিজেদের জন্য সময় বের করতে পারেন এবং বয়স বা পারিবারিক দায়িত্বকে নতুন কিছু শুরু করার একমাত্র বাধা হিসেবে না দেখেন, সেটিই তার প্রত্যাশা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে একজন স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাট হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলতে চান তিনি।
এই পথচলায় আর্থিক চাপও রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ঋণ করতে হয়েছে তাকে। তাই পরবর্তী লক্ষ্যগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সেই ঋণ পরিশোধ করা। বড় স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের আর্থিক দায়িত্বের কথাও অকপটে স্বীকার করেন তিনি। তার কাছে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে টেকসইভাবে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকাও জরুরি।
সাজিয়া সুলতানার গল্পের বিশেষত্ব এখানেই। তিনি কোনো পেশাদার অ্যাথলেট হিসেবে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি নিয়ে খেলাধুলার জগতে প্রবেশ করেননি। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেই নতুন আগ্রহকে লক্ষ্য বানিয়েছেন, শিখেছেন সাঁতার ও সাইক্লিং, প্রস্তুতি নিয়েছেন দীর্ঘ দূরত্বের প্রতিযোগিতার জন্য। এরপর আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের সক্ষমতার পরীক্ষা দিয়েছেন। দুর্ঘটনা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতা যেমন তার যাত্রার অংশ, তেমনি রয়েছে পরিবারের সহযোগিতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিজের প্রতি অবিচল থাকার শিক্ষা।
একজন কর্মজীবী নারী, একজন মা এবং একজন অ্যাথলেট হিসেবে সাজিয়া দেখিয়েছেন, জীবনের এক পর্যায়ে এসে নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন পরিকল্পনা, ধারাবাহিক অনুশীলন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং কাছের মানুষের সহযোগিতা। বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করার তার দাবি যদি স্বীকৃত রেকর্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা দেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও হবে উল্লেখযোগ্য একটি অর্জন। আর তার নিজের কাছে এই ‘প্রথম’ পরিচয় কেবল একটি রেকর্ড নয়, বরং অন্য নারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার দায়িত্ব।
সূত্র: প্রথম আলো



