১৮ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২ কার্তিক ১৪৩৩
বিশ্ব

টাকার বিনিময়ে টাইফুনের অভিজ্ঞতা নিতে ভিড় করছেন চীনের পর্যটকেরা

f38e39f7b50bb1ed8c35092fce148f49-6ad4a7792d435

‘ভয় কেনার খরচ’ কিংবা ‘কষ্ট পাওয়ার বিনিময় অর্থ ব্যয়’—চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইদানীং এমন অদ্ভুত কিছু বাক্যাংশ বেশ ঝড় তুলেছে। অদ্ভুত শোনালেও, বিষাদময় ও থ্রিলিং অভিজ্ঞতার খোঁজে ঘুরে বেড়ানো ‘ডার্ক ট্যুরিজম’ বা অন্ধকার পর্যটনের প্রতি মানুষের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এরই প্রকাশ।

হাংঝৌর ‘লিউশিং বেজ’ নামের একটা প্রতিষ্ঠান এখন ইন্টারনেটে বেশ আলোচনায়। দুই লাখ বর্গমিটারের এই কেন্দ্রে কৃত্রিমভাবে টাইফুন আর পাহাড়ি ধসের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বাস্তব দুর্যোগের মতোই অনুভূতি পান। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতারা বলছেন, তারা বিশ্বের নানা প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ দশ বছর ধরে প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০২৪ সালে এই কেন্দ্র চালু করেন।

জেনারেল ম্যানেজার ওয়াং কুয়াংহান বলছেন, অনেকেই রোমাঞ্চের খোঁজে আসেন। তারা জানতে চান আসল টাইফুন আর মুষলধারে বৃষ্টি কেমন লাগে, নিজেরা কতটা সহ্য করতে পারেন। আমাদের বেশিরভাগ গ্রাহক ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী। প্রতিষ্ঠানটি আগামী তিন বছরে চীনজুড়ে আরও পাঁচটি কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা করছে। ভূমিকম্প আর অগ্নিকাণ্ডের কৃত্রিম পরিস্থিতিও যোগ করার কথা ভাবছে তারা।

এ ধরনের আয়োজন শুধু বেসরকারি উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিংয়ের হেইদিয়ান পাবলিক সেফটি মিউজিয়ামে ৪ডি থিয়েটার ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের কৃত্রিম ভূমিকম্প, সুনামি আর অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়। গোয়াংঝুতেও জরুরি অবস্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণের জন্য পাঁচতলা একটা কেন্দ্র চালু হয়েছে। সেখানকার ভূমিকম্প সিমুলেটর ৭.২ মাত্রার কম্পন তৈরি করতে পারে।

চীনে বৈরী আবহাওয়া এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ২০২৫ সালে দেশটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার দিনগুলো দেখেছে। একই সঙ্গে ১০টি টাইফুনের আঘাতও সহ্য করতে হয়েছে, যা স্বাভাবিক বছরের গড়ের চেয়ে বেশি। জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এসব দুর্যোগে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালে স্থানীয় সরকারগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে নিরাপত্তা কেন্দ্র, জাদুঘর ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কৃত্রিম দুর্যোগের মহড়া ব্যবহার করে মানুষকে বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে ব্যবস্থা নিতে হয় তা শেখানো হয়।

হংকংয়ের চাইনিজ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টের পরিচালক রবার্ট লি বলছেন, চীনের নতুন প্রজন্মের পর্যটকরা শুধু বিখ্যাত জায়গা দেখে সন্তুষ্ট হন না। তারা কোনো স্থানের পরিস্থিতি সরাসরি অনুভব করতে বেশি আগ্রহী।

Advertisements

তবে অনেকেই শুধু কৃত্রিম অভিজ্ঞতায় থেমে থাকছেন না। তারা আসল ধ্বংস ও মৃত্যুর স্থানগুলোতেও যাচ্ছেন। ২০০৮ সালের মে মাসে সিচুয়ান প্রদেশে ৮.০ মাত্রার ভূমিকম্পে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে বেইচুয়ানের ধ্বংসাবশেষ এখনো সংরক্ষিত আছে। ৩০ বছর বয়সী লেখিকা অ্যালিস সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি দেখেছেন, স্কুল ভবন ধসে শিক্ষার্থীরা চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল এমন স্থানগুলো। ইংসুয়ে শহরের এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষের মাঝে একটা ভাঙা ঘড়ি এখনো ২টা ২৮ মিনিটে থমকে আছে, ঠিক যে সময় ভূমিকম্প আঘাত হানে।

অ্যালিস বলেন, প্রকৃতির বিধ্বংসী ক্ষমতা দেখে আর কত শিশু যে সেখান থেকে বাঁচতে পারেনি তা ভেবে আমি শিউরে উঠেছিলাম। পুরোনো শহরটা এখন ভুতুড়ে নগরীর মতো। কেউ আর সেখানে বাস করে না। তিনি এই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা চীনা ভাষার সাবস্ট্যাক অ্যাকাউন্ট খোলার পরিকল্পনা করছেন। তার মতে, ডার্ক ট্যুরিজম কোনো দেশকে তার অতীতের তিক্ত ইতিহাসের সঙ্গে মানিয়ে চলতে সাহায্য করতে পারে। যদিও সরকারই ঠিক করে কোন স্মৃতি ইতিহাসে থাকবে।

একজন পর্যটক কৃত্রিম বন্যার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, শত শত টন পানি যখন লোকজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন মুহূর্তের জন্য মাথা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ভুলেই গিয়েছিলাম এটা মহড়া। বন্যার সময় কীভাবে শান্ত থাকতে হয়, নিজেকে কীভাবে রক্ষা করতে হয় এসব শিখেছি। কোনো বই বা স্কুলে এভাবে শেখানো সম্ভব নয়।

সম্প্রতি নানজিং গণহত্যা স্মৃতিসৌধে চীনা পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যুর গাইড সামান্থা ওয়াং। ১৯৩৭ সালে জাপানি সেনাবাহিনী নানজিং দখল করে। চীনের সরকারি হিসাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা গণহত্যায় প্রায় তিন লাখ মানুষ প্রাণ হারান। জাপান অবশ্য নিহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন বলে মনে করে। স্মৃতিসৌধে প্রবেশ বিনামূল্যে, তবে আগে থেকে অনলাইনে বুকিং করতে হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিদিন ২৫ হাজার জায়গা সংরক্ষিত রাখে। আগস্ট মাসে টিকিট প্রায়ই আগেভাগেই শেষ হয়ে যায়।

ওয়াং বলেন, চীনে এ ধরনের আরও অনেক হৃদয়বিদারক স্থান আছে। মানুষ এসব জানতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এটা একটা নতুন ধারা। স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিহতদের ছবি টাঙানো আছে। তিনি বলেন, দর্শনার্থীরা যখন নিহত শিশুদের ছবি দেখেন, তখন গভীরভাবে ব্যথিত হন। কিন্তু পরিদর্শনের পর স্বস্তি অনুভব করেন এবং দেশকে আরও শক্তিশালী করতে অনুপ্রাণিত হন।

Advertisements