১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

শব্দের টানে ফাঁদে এডিস মশা, শনাক্ত করবে AI

2b106a041b6c2223072ca5c9e85b4b74-671f8831db958

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গবেষকদের উদ্ভাবিত এক অভিনব প্রযুক্তি। শব্দের মাধ্যমে এডিস মশাকে আকৃষ্ট করা, ক্যামেরায় ছবি ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে মশা শনাক্ত ও গণনা—সব কাজই করতে পারবে একটি যন্ত্র। ‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ নামের এই প্রযুক্তি মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করতে সহায়ক হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা যৌথভাবে যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। এর বিশেষত্ব হলো, মশা শনাক্ত করতে প্রতিবার মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে না। ফাঁদে ধরা পড়া মশার ছবি ক্যামেরার মাধ্যমে সংগ্রহ করে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ক্লাউডভিত্তিক এআই ব্যবস্থায় পাঠানো হবে। পরে ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে এডিস মশা শনাক্ত ও গণনা করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সাধারণত প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাঁদ থেকে মশা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে নিয়ে প্রজাতি শনাক্ত করতে হয়। এতে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি লাগে। নতুন প্রযুক্তিটি সেই প্রক্রিয়াকে অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

শব্দই হবে মশা আকর্ষণের কৌশল

মাস্ট-ক্লাউডনেটের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো এর শব্দভিত্তিক ফাঁদ। স্ত্রী মশার ডানার ঝাপটার অনুকরণে বিশেষ শব্দ তৈরি করে যন্ত্রটি পুরুষ এডিস মশাকে আকৃষ্ট করে। গবেষকদের পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, শব্দ ব্যবহার করা ফাঁদে নীরব ফাঁদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিনের প্রাথমিক মাঠপরীক্ষাতেও আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যায়। শব্দযুক্ত ফাঁদে এডিসসহ মোট ৫৯টি মশা ধরা পড়ে, যার মধ্যে ৪৯টি ছিল এডিস। অর্থাৎ, সংগৃহীত মশার প্রায় ৮৩ দশমিক ১ শতাংশই ছিল এডিস প্রজাতির। বিপরীতে, নীরব ফাঁদে মোট চারটি মশা ধরা পড়ে, যার মধ্যে এডিস ছিল মাত্র একটি।

তবে মশা আকৃষ্ট করতে পারা আর সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারা এক বিষয় নয়। মাঠপরীক্ষায় ধরা পড়া ৪৯টি এডিস মশার মধ্যে এআই ৩৫টি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। শনাক্তকরণের এই হার প্রায় ৭১ শতাংশ। বৃষ্টি, বাতাস ও ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কোলাহলের মধ্যেও যন্ত্রটি কাজ করেছে। তারপরও বাস্তব পরিবেশে এর নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কীভাবে কাজে আসবে?

Advertisements

গবেষকদের প্রত্যাশা, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি এবং সময়ের সঙ্গে তাদের সংখ্যার পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়া যাবে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোথায় মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করা বা অপসারণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে পারবে। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।

তবে প্রযুক্তিটির সক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখা জরুরি। ডেঙ্গু ছড়ায় স্ত্রী এডিস মশা, অথচ এই যন্ত্রের শব্দভিত্তিক পদ্ধতি মূলত পুরুষ মশাকে আকৃষ্ট করে। তাই কোনো এলাকায় পুরুষ এডিসের উপস্থিতি থেকে মশার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও, শুধু এই তথ্য দিয়ে সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম স্ত্রী মশার সংখ্যা কিংবা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। গবেষকদের মতে, মাস্ট-ক্লাউডনেট প্রচলিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং এটি নজরদারি ও পর্যবেক্ষণের একটি সহায়ক প্রযুক্তি। যন্ত্রটির আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৯৯ ডলার।

গবেষণাগার থেকে আবাসিক এলাকায় পরীক্ষার পরিকল্পনা

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব, একই বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ মাহমুদ উল্লাহ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আশফাকুল মুইদ। গবেষণাটি চলতি বছর IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

নিউ এজকে দেওয়া বক্তব্যে মো. আহসান হাবিব জানান, প্রযুক্তিটি কোনো এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি ও সংখ্যার পরিবর্তন সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তথ্য দিতে পারে। এর ফলে প্রজননস্থল অপসারণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করা সহজ হবে। গবেষক দলটি ২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি যন্ত্র বসিয়ে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছে। এ পরীক্ষায় বাস্তব পরিবেশে এআইয়ের শনাক্তকরণ ক্ষমতা, প্রতিকূল আবহাওয়ায় যন্ত্রের কার্যকারিতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সক্ষমতা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও আরও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে।

কম খরচে আরও উন্নত প্রযুক্তির লক্ষ্য

প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেওয়া গবেষক দলের সদস্য এবং গবেষণাপত্রের সহলেখক তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী আতিকে বি জাকিরের মতে, হার্ডওয়্যার ও এআই সফটওয়্যারকে একই ব্যবস্থায় সমন্বয় করাই ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষায়িত পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম, যন্ত্রাংশ তৈরি এবং বিদেশ থেকে উপকরণ আমদানির কারণে প্রাথমিক নমুনা তৈরিতে ব্যয়ও বেড়েছে।

তিনি মনে করেন, গবেষণায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়লে এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। এদিকে, মাস্ট-ক্লাউডনেটের পরবর্তী সংস্করণ উন্নয়নের কাজও চলছে। ছবি বিশ্লেষণের পরিবর্তে মশার ডানার ঝাপটার শব্দ শনাক্ত করে এডিস চেনার একটি কম খরচের পদ্ধতি নিয়েও পরীক্ষা করছেন গবেষকেরা।

ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় মশার প্রজননস্থল দ্রুত শনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে মাস্ট-ক্লাউডনেটের মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বৃহত্তর পরিসরে পরীক্ষা, শনাক্তকরণের নির্ভুলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার পরই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এর প্রকৃত অবদান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

Advertisements