১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
রূপ-সৌন্দর্য

চুল রিব‌ন্ডিং করার পর যেভাবে যত্ন নেবেন

ribonding-hair-1

মসৃণ, সোজা ও ঝলমলে চুল পেতে অনেকেই বেছে নেন হেয়ার রিবন্ডিং। রাসায়নিক উপাদান ও উচ্চ তাপের সাহায্যে চুলের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তন করে এই পদ্ধতিতে চুল সোজা করা হয়। তবে রিবন্ডিংয়ের পর চুল দেখতে সুন্দর হলেও এর গঠন দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। ফলে প্রয়োজনীয় যত্নের অভাবে চুলে দেখা দিতে পারে শুষ্কতা, আগা ফেটে যাওয়া, ভেঙে পড়া কিংবা উজ্জ্বলতা হারানোর মতো সমস্যা।

তাই পারলার থেকে ফিরে প্রথম কয়েক দিন চুলের যত্নে সতর্ক থাকার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদেও কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি। সঠিক পদ্ধতিতে চুলের পরিচর্যা করলে রিবন্ডিং করা চুলের মসৃণতা বজায় রাখা এবং ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

১. বেছে নিন মৃদু শ্যাম্পু

রিবন্ডিংয়ের পর চুল পরিষ্কারের জন্য উপযুক্ত শ্যাম্পু নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে মৃদু, সালফেটমুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন। তবে সব ধরনের সালফেট বা প্যারাবেনযুক্ত প্রসাধনীই ক্ষতিকর—এমন নয়; চুলের ধরন ও মাথার ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়া ভালো। চুল অতিরিক্ত ঘন ঘন ধোয়ার প্রয়োজন নেই। মাথার ত্বক তৈলাক্ত হওয়া, ঘাম, ধুলাবালি এবং চুলের ধরন বিবেচনায় ধোয়ার বিরতি ঠিক করুন। অনেকের ক্ষেত্রে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার চুল ধোয়া যথেষ্ট হতে পারে।

রিবন্ডিংয়ের পর প্রথম কয়েক দিন চুল ভেজানো, বাঁধা বা ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখার বিষয়ে পারলারের নির্দেশনা মেনে চলুন। বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী পরিচর্যার নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।

২. কন্ডিশনার ও হেয়ার মাস্কে দিন বাড়তি গুরুত্ব

Advertisements

রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় চুলের আর্দ্রতা ও স্থিতিস্থাপকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে প্রতিবার শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনার ব্যবহার করা উপকারী। চুলের মাঝের অংশ থেকে আগা পর্যন্ত কন্ডিশনার লাগান। মাথার ত্বকে পণ্য জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেখানে না লাগানোই ভালো।

সপ্তাহে একবার ময়েশ্চারাইজিং হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। আরগান অয়েল, গ্লিসারিন বা অন্যান্য আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়ক উপাদানযুক্ত পণ্য চুলকে নরম ও সহজে আঁচড়ানোর উপযোগী করতে পারে। পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় রেখে ধুয়ে ফেলুন। তবে হেয়ার মাস্ক চুলের ক্ষতিগ্রস্ত গঠন পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারে না। অতিরিক্ত প্রোটিনযুক্ত পণ্য ব্যবহার না করে চুলের প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজিং ও কন্ডিশনিং পণ্য নির্বাচন করুন।

৩. অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিক ব্যবহার এড়িয়ে চলুন

রিবন্ডিংয়ের সময় চুল ইতিমধ্যে রাসায়নিক ও তাপের সংস্পর্শে আসে। এরপর নিয়মিত স্ট্রেইটনার, কার্লিং আয়রন বা উচ্চ তাপের হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করলে চুল আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে চুল স্বাভাবিক বাতাসে শুকাতে দিন। হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করতেই হলে কম তাপমাত্রা বেছে নিন এবং উপযুক্ত হিট প্রোটেক্ট্যান্ট ব্যবহার করুন।

রিবন্ডিংয়ের পরপরই চুলে কালার, ব্লিচ বা অন্য কোনো রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট করানো থেকে বিরত থাকুন। কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, তা চুলের অবস্থা ও ব্যবহৃত রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করে। নতুন কোনো ট্রিটমেন্টের আগে অভিজ্ঞ হেয়ার স্টাইলিস্টের পরামর্শ নিন। চুল ভেঙে যাওয়া বা অতিরিক্ত শুষ্কতার লক্ষণ থাকলে রাসায়নিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলাই ভালো।

৪. আলতো হাতে চুল আঁচড়ান

রিবন্ডিং করা চুলে জট ছাড়ানোর সময় অতিরিক্ত টান দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ভেজা চুল তুলনামূলক দুর্বল থাকে। তাই তোয়ালে দিয়ে ঘষে না মুছে আলতোভাবে পানি শুষে নিন। এরপর চুল কিছুটা শুকালে চওড়া দাঁতের চিরুনি দিয়ে আগা থেকে ধীরে ধীরে জট ছাড়ান। চুল শক্ত করে বাঁধা, আঁটসাঁট পনিটেল করা কিংবা দীর্ঘ সময় ক্লিপ দিয়ে চেপে রাখলে চুলে ভাঁজ পড়তে পারে এবং গোড়ায় টান সৃষ্টি হতে পারে। তাই ঢিলেঢালা হেয়ার স্টাইল বেছে নিন।

রাতে ঘুমানোর সময় স্যাটিন বা সিল্কের বালিশের কভার ব্যবহার করতে পারেন। এসব কাপড়ে চুলের ঘর্ষণ কম হতে পারে, ফলে জট ও ভাঙার ঝুঁকি কিছুটা কমে।

৫. রোদ, ধুলাবালি ও সুইমিংপুলের পানি থেকে সুরক্ষা

দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, দূষণ ও ধুলাবালির সংস্পর্শ চুলের শুষ্কতা বাড়াতে পারে। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা স্কার্ফ দিয়ে চুল ঢেকে রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে চুলের জন্য তৈরি ইউভি-প্রোটেকশন পণ্য ব্যবহার করতে পারেন। সুইমিংপুলের ক্লোরিনযুক্ত পানি চুলের আর্দ্রতা কমিয়ে শুষ্কতা বাড়াতে পারে। তাই সাঁতারের সময় সুইমিং ক্যাপ ব্যবহার করুন। সাঁতার শেষে পরিষ্কার পানি দিয়ে চুল ধুয়ে কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুলের পরিচর্যা সহজ হয়।

৬. নিয়মিত আগা ছাঁটুন

চুলের আগা ফেটে গেলে তা ধীরে ধীরে আরও ওপরে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত চুলের আগা ছাঁটা ভালো। অনেকের ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন মাস অন্তর সামান্য ট্রিম করা উপকারী হতে পারে। তবে চুলের বৃদ্ধি, আগার অবস্থা ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী এই সময়ের পরিবর্তন হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ট্রিম করলে চুলের আগার ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বাদ যায়; কিন্তু এতে চুল দ্রুত বাড়ে না বা গোড়া থেকে চুল পড়া বন্ধ হয় না।

৭. খাবারের দিকেও নজর দিন

চুল সুস্থ রাখতে বাহ্যিক পরিচর্যার পাশাপাশি সুষম খাদ্যও গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, ডাল, দুধ, বাদাম, শাকসবজি ও ফলমূল রাখুন। এসব খাবার থেকে প্রোটিন, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় খনিজ পাওয়া যায়, যা চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বায়োটিন বা অন্য কোনো ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন নেই। পুষ্টির ঘাটতি না থাকলে অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট চুলের স্বাস্থ্য বাড়াবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

চুল অস্বাভাবিকভাবে ভেঙে গেলে, অতিরিক্ত ঝরতে থাকলে কিংবা মাথার ত্বকে জ্বালাপোড়া দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুন্দর চুলের জন্য চাই নিয়মিত পরিচর্যা

রিবন্ডিংয়ের সৌন্দর্য ধরে রাখতে শুধু দামি প্রসাধনী ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়। চুলের ধরন অনুযায়ী মৃদু শ্যাম্পু, নিয়মিত কন্ডিশনিং, কম তাপে স্টাইলিং এবং আলতো হাতে চুলের পরিচর্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নতুন রাসায়নিক ট্রিটমেন্টের আগে চুলের অবস্থা যাচাই করতে হবে।

মনে রাখবেন, রিবন্ডিং চুলের গঠন পরিবর্তন করে; এটি চুলকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিমুক্ত রাখে না। নিয়মিত ও সঠিক যত্নের মাধ্যমে চুলের মসৃণতা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত ক্ষতি এড়িয়ে চলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

Advertisements