১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

একই পরিবারের ছয়জনই মানসিক রোগী, কাটছে মানবেতর জীবন

image_337997_1791782185

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একটি জরাজীর্ণ ঘরে চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে ছয় সদস্যের এক পরিবারের। স্বামী, স্ত্রী ও চার সন্তান—পরিবারের প্রত্যেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। ফলে নিয়মিত কাজ করে পরিবারের ব্যয় বহন করার মতো কেউ নেই। এমন পরিস্থিতিতে নিজের অসুস্থতা নিয়েই অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন ৫৫ বছর বয়সী দোলেনা বেগম।

রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুর হেলান গ্রামের এই পরিবারে রয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী রঞ্জন, তাঁর স্ত্রী দোলেনা বেগম এবং তাঁদের চার সন্তান রনজি খাতুন (৩০), দেলোয়ার (২৩), অধিফা খাতুন (২০) ও দানিয়েল (১৭)। পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা, অভাব এবং চিকিৎসার সীমিত সুযোগ তাঁদের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলেছে।

পরিবারের দাবি, রঞ্জন জন্ম থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘রঞ্জন পাগলা’ নামে পরিচিত। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদেরও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে পরিবারটি জানিয়েছে। তবে তাঁদের সবার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত চিকিৎসাগত মূল্যায়নের তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরিবারটির মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই অন্যের জমিতে তৈরি একটি ভাঙাচোরা ঘর। সেখানে পর্যাপ্ত খাবার জোটানোই কঠিন, আর নিয়মিত চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি অসুস্থতার কারণে পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হচ্ছে। পারিবারিক অস্থিরতা ও নানা সমস্যার মধ্যে তাঁদের দিন কাটে।

এই কঠিন বাস্তবতায় পরিবারের প্রধান অবলম্বন দোলেনা বেগম। নিজের অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যান। দিন শেষে যে সামান্য মজুরি পান, তা দিয়ে পরিবারের ছয় সদস্যের খাবারের ব্যবস্থা করেন। এর সঙ্গে তিন মাস পরপর পাওয়া সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ যোগ হলেও সংসারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না।

নিজেদের দীর্ঘদিনের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে দোলেনা বেগম জানান, অভাবের সংসারে স্বামী কোনো কাজ করতে পারেন না। অনেক কষ্টে চার সন্তানকে বড় করেছেন তিনি। কিন্তু সন্তানরাও অসুস্থ হওয়ায় পরিবারের দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

Advertisements

পরিবারটির পরিস্থিতি সম্পর্কে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন বলেন, পরিবারের সদস্যরা সরকারি ভাতার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে সরকারিভাবে নতুন কোনো সুযোগ-সুবিধা চালু হলে তাঁদের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

অন্যদিকে, কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, পরিবারটির বিষয়ে আগে তিনি অবগত ছিলেন না। তাঁরা হাসপাতালে এলে চিকিৎসাসংক্রান্ত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের মতে, পরিবারটির দুর্দশা লাঘবে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সদস্যদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, নিয়মিত চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার এবং নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দোলেনা বেগমের সামান্য আয় আর সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারটির জীবন যেন প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। যথাযথ চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমতে পারে। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষের কার্যকর উদ্যোগ, যাতে পরিবারটির সদস্যরা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পান।

Advertisements