দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ ধুনুচি নাচ, ঐতিহ্য থেকে উৎসবের মঞ্চে

পুরাণ অনুসারে মহিষাসুর বধের আগে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ধুনুচি নাচে মেতেছিলেন মা দুর্গা। তা থেকেই বিশ্বাস, এই নাচের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাবে নিজেকে মা দুর্গার কাছে সমর্পণ করা যায়। আর তাতেই দূর হয় আশপাশের সমস্ত অশুভ শক্তি। জ্বলন্ত ধুনুচি হাতে নাচের এই রীতি তাই চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে।
অষ্টমীর সকাল হোক বা নবমীর রাত, সপ্তমীর সন্ধে হোক বা দশমীর ভাসান – ধুনুচি নাচ ছাড়া বাঙালির দুর্গাপুজো অসম্পূর্ণ। মাটির ধুনুচিতে ধূপ এবং ধুনো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সেই জ্বলন্ত ধুনুচি কখনও হাতে, কখনও মুখে, কখনও বা কোমরে রেখে নাচের তালে মেতে ওঠা। ঢাকের বোলের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে সেই নাচ যেন অন্য মাত্রা বহন করে।

দুর্গাপূজার মণ্ডপে ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ, ধূপের সুবাস আর চারদিকে উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ধুনুচি হাতে নৃত্যে মেতে ওঠেন নারী-পুরুষ। কখনো দুই হাতে দুটি ধুনুচি, কখনো বা মুখে কিংবা কোমরের ছন্দময় ভঙ্গিতে ফুটে ওঠে নৃত্যের নানা মুদ্রা। ঢাকের তালে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেদ করে এগিয়ে চলা এই দৃশ্য যেন বাঙালির শারদীয় উৎসবের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এই ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার নাম ধুনুচি নাচ।
ধুনুচি নাচের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় তাৎপর্য
ধুনুচি নাচ হিন্দু ধর্মীয় আচার ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দুর্গাপূজার সময় দেবীর আরতি ও পূজার বিভিন্ন পর্বে ধুনুচি ব্যবহার করা হয়। ধুনুচি মূলত মাটির তৈরি একধরনের পাত্র, যাতে জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর ধুনো ও অন্যান্য সুগন্ধি উপকরণ দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। সেই ধুনুচি হাতে নিয়ে ঢাকের তালে নৃত্য করাই ধুনুচি নাচ হিসেবে পরিচিত।

ধুনুচি নাচের মূল আকর্ষণ শুধু এর নান্দনিকতা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আনন্দের প্রকাশ। পূজার পরিবেশে ধুনুচির ধোঁয়া, শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টা আর ঢাকের শব্দ মিলেমিশে তৈরি করে এক বিশেষ আবহ। অনেকের কাছে এটি দেবীর প্রতি ভক্তি নিবেদনের একটি আনন্দময় মাধ্যম।
কখন হয় ধুনুচি নাচ?
দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীতে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ধুনুচি নাচের আয়োজন দেখা যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যার আরতির সময় এর আমেজ থাকে আলাদা। তবে কোন দিন ধুনুচি নাচ হবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পূজামণ্ডপের আয়োজন ও রীতিনীতির ওপর।
মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধ্যায় অনেক মণ্ডপে ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। কেউ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, কেউ আবার নাচের বিশেষ ভঙ্গি ও কৌশলে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। ঢাকিরা তালের গতি বাড়ালে নৃত্যশিল্পীদের পদক্ষেপেও আসে নতুন ছন্দ। দর্শকদের করতালি আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মণ্ডপ।

শুধু নাচ নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়
ধুনুচি নাচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির উৎসবপ্রিয়তা ও সামাজিক বন্ধনের গল্প। পূজামণ্ডপে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার দৃশ্য এই নাচকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পূজা দেখতে আসা শিশুদের কাছে ধুনুচি নাচ যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি প্রবীণদের কাছে এটি স্মৃতিময় এক ঐতিহ্য।
সময় বদলেছে, বদলেছে নাচের উপস্থাপনাও। একসময় ধুনুচি নাচ মূলত পূজার আচারকেন্দ্রিক পরিবেশনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় এটি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ধুনুচি নাচের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এই ঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
তবে ধুনুচি নাচের সৌন্দর্য ধরে রাখতে এর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আগুনের ব্যবহার থাকায় অংশগ্রহণকারীদের সতর্কতাও প্রয়োজন। ঢিলেঢালা বা সহজে আগুন ধরে যেতে পারে এমন পোশাক এড়িয়ে চলা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে নাচ পরিবেশন করা উচিত।
ঢাকের তালে উৎসবের পূর্ণতা

দুর্গাপূজার আনন্দকে পূর্ণতা দেয় নানা আচার, সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। তার মধ্যে ধুনুচি নাচের আবেদন স্বতন্ত্র। ধোঁয়ায় আবছা হয়ে আসা মণ্ডপ, ঢাকের তালে নৃত্যের ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে শারদীয় উৎসবের স্মরণীয় মুহূর্ত।
ধুনুচি নাচ তাই কেবল একটি নৃত্য পরিবেশনা নয়; এটি ভক্তি, ঐতিহ্য, আনন্দ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সম্মিলিত প্রকাশ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই আয়োজন বেঁচে থাকুক উৎসবের সৌন্দর্য হয়ে, ঢাকের তালে আর ধুনুচির ধোঁয়ায় মিশে থাকুক শারদীয় দুর্গোৎসবের চিরচেনা আবেগ।



