১১ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

সন্তানের প্রাইভেসি বিক্রি করে দিচ্ছেন না তো? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুর ছবি-ভিডিও প্রকাশের অদৃশ্য ঝুঁকি

0SamakalAH_1791078392

একটি শিশুর প্রথম হাঁটা, আধো আধো কথা বলা, দুষ্টুমি কিংবা ঘুমের মধ্যে মিষ্টি হাসি—অভিভাবকের কাছে প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য। সেই আনন্দ অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে অনেকেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেন সন্তানের ছবি ও ভিডিও। কখনো সন্তানের কান্না, রাগ, বায়না, গোসল কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তও জায়গা পায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পরিচিতজনদের ভালোবাসা, প্রশংসা আর মন্তব্যে খুশি হন বাবা-মা। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—সন্তানের ব্যক্তিগত জীবনকে এভাবে সবার সামনে তুলে ধরার অধিকার কি সত্যিই অভিভাবকের আছে?

ভালোবাসার প্রকাশ, নাকি ব্যক্তিগত জীবনের অনিচ্ছাকৃত উন্মোচন?

সন্তানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও প্রকাশের প্রবণতাকে অনেকে স্বাভাবিক পারিবারিক স্মৃতি ভাগাভাগি হিসেবেই দেখেন। সন্তানের বেড়ে ওঠার গল্প দূরে থাকা আত্মীয়স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া কিংবা জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলো সংরক্ষণ করার ইচ্ছা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এই ভাগাভাগির সীমা অতিক্রম করে শিশুর ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ্যে চলে আসে। একটি শিশু এখনো বোঝে না তার ছবি কোথায় প্রকাশিত হচ্ছে, কারা দেখছে কিংবা ভবিষ্যতে সেই ছবি কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। অথচ তার শৈশবের বহু মুহূর্ত অভিভাবকের একটি সিদ্ধান্তেই স্থায়ীভাবে ডিজিটাল জগতে জায়গা করে নিচ্ছে। যে শিশুর নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণের সক্ষমতা তৈরি হয়নি, তার হয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে দীর্ঘমেয়াদে।

একবার প্রকাশ, তারপর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করার পর সেটির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন। পরিচিতজনের কাছে পাঠানো ছবি অন্য কেউ সংরক্ষণ করতে পারেন, স্ক্রিনশট নিতে পারেন কিংবা অনুমতি ছাড়াই অন্যত্র ছড়িয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।বিশেষ করে শিশুর স্কুলের নাম, বাসার আশপাশ, নিয়মিত যাতায়াতের স্থান, পোশাকের পরিচিত চিহ্ন কিংবা দৈনন্দিন রুটিন প্রকাশ পেলে তার ব্যক্তিগত তথ্য সম্পর্কে অন্যরা ধারণা পেতে পারে। প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে নিরীহ মনে হলেও একাধিক পোস্ট মিলিয়ে শিশুর জীবনযাপনের একটি বিস্তারিত চিত্র তৈরি হতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, শিশুর স্বাভাবিক ছবি বা ভিডিও অন্যের হাতে গিয়ে অপব্যবহারের শিকার হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ছবি পরিবর্তন, ভুয়া পরিচয় তৈরি কিংবা অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরির ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

Advertisements

জনপ্রিয়তার দৌড়ে শিশুর ব্যবহার

কিছু ক্ষেত্রে শিশুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা, অনুসারীর সংখ্যা কিংবা আয় বাড়ানোর চেষ্টা দেখা যায়। শিশুর স্বাভাবিক আচরণকে অভিনয়ের মতো উপস্থাপন করা, কান্না বা ভয়কে বিনোদনের উপাদান বানানো কিংবা বারবার ভিডিও ধারণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা প্রশ্ন তোলে।
এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় শুধু অর্থ উপার্জন নয়, শিশুর সম্মতি ও কল্যাণ। একটি শিশু ক্যামেরার সামনে হাসছে বলেই যে সে প্রকাশ্যে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিণতি বুঝছে, তা নয়। আবার শিশুর আপত্তি, অস্বস্তি কিংবা ক্লান্তি উপেক্ষা করে কনটেন্ট তৈরি করা তার স্বাভাবিক বিকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তবে সন্তানকে নিয়ে প্রতিটি পোস্টই ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে কী প্রকাশ করা হচ্ছে, কত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, শিশুর সম্মতি ও স্বাচ্ছন্দ্য কতটা বিবেচনা করা হচ্ছে এবং প্রকাশের উদ্দেশ্য কী—এসব বিষয়ের ওপর।

দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের নতুন পরীক্ষা

সন্তানের ছবি প্রকাশের আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। ছবিটি কি শিশুর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করছে? অপরিচিত কেউ এটি দেখলে কোনো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি? সন্তান বড় হয়ে ছবিটি দেখলে স্বস্তি বোধ করবে, নাকি বিব্রত হবে? প্রয়োজন না থাকলে ব্যক্তিগত তথ্য, অবস্থান, স্কুলের পরিচয় ও দৈনন্দিন রুটিন প্রকাশ না করাই ভালো।

অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা-সংক্রান্ত ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা, মন্তব্য ও দর্শক নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যদের শিশুর ছবি পুনরায় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানোও সহায়ক হতে পারে। বয়স ও বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী সন্তানের মতামত নেওয়া জরুরি। সে ছবি তুলতে বা প্রকাশ করতে না চাইলে তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানের প্রতিটি মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ছবি ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করা কিংবা সীমিত পরিসরে পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াও স্মৃতি ধরে রাখার সুন্দর উপায়।

কারণ, বাবা-মা হয়তো একটি মুহূর্ত ভাগ করে নিচ্ছেন; কিন্তু সন্তান না বুঝেই দিয়ে ফেলতে পারে তার ব্যক্তিগত জীবনের এমন একটি অংশ, যা ফিরিয়ে নেওয়া পরে আর সম্ভব হবে না।

Advertisements